২০২৫ সালে চিলির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হোসে আন্তোনিও কাস্ত এর বিজয় একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি, যার সূচনা ঘটেছিল ছয় বছর আগে, আপাতদৃষ্টিতে এক মেট্রো ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে। ২০১৯ সালের অক্টোবরের গণঅভ্যুত্থান চিলির আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতার দীর্ঘদিনের মিথ ভেঙে দেয়। এক বছর পরে, গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পিনোচেত-যুগের সংবিধান বাতিলের পক্ষে রায় দেন। আর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে একসময়ের বামপন্থী ছাত্রনেতা রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন ও প্রতিশ্রুতি দেন, নব-উদারবাদকে কবর দিয়ে এক নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা করবেন। কিন্তু চার বছরের মধ্যেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। ট্যাংকের প্রয়োজন হয় নি – ভোটের মাধ্যমেই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
এই প্রত্যাবর্তনের ব্যাখ্যা নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক মত তৈরি হয়েছে। কেউ একে বিশ্বব্যাপী দক্ষিণপন্থী জোয়ারের অংশ বলে মনে করেন। যেমন ইউরোপে কর্তৃত্ববাদী শক্তির উত্থান, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প-জমানা, লাতিন আমেরিকায় বলসোনারো ও মিলেইয়ের আবির্ভাব। অনেকে সমসাময়িক ব্যর্থতা – মূল্যস্ফীতি, নিরাপত্তাহীনতা, অভিবাসন ও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সরকারের দুর্বলতার মধ্যে এর উৎস খুঁজে পান। আবার বহু বিশ্লেষক মনে করেন লিঙ্গ, বহুজাতিকতা বা পরিবেশনীতি নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি সমাজের রক্ষণশীল অংশকে চিলির বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে একজোট করেছে। এই ব্যাখ্যাগুলি প্রত্যেকটিই আংশিক সত্য বহন করে, কিন্তু এককভাবে কোনোটিই যথেষ্ট নয়। বরং এই প্রশ্ন অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ, কেন সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে পুঁজিবাদী সমাজের সংস্কারমূলক প্রকল্পগুলো বারবার সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে, এবং কেন শ্রেণি-ক্ষমতার কাঠামোকে না অপসারিত করে রাজনৈতিক রূপান্তর স্থায়ী হয় না।
এই প্রশ্নগুলি বিশ্লেষণের জন্য চিলি বিশেষভাবে উপযুক্ত। এখানেই সামরিক স্বৈরতন্ত্র প্রথমবারের মতো নব-উদারবাদ চাপিয়ে দেয়। পরবর্তীতে একটি সমঝোতমূলক গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটে, যা বহুদলীয় নির্বাচন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেও মূল সামাজিক সম্পর্কগুলিকে অক্ষত রাখে। এবং এখানেই, আরও আগে, বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংসদীয় সমাজতান্ত্রিক প্রকল্প – সালভাদোর আইয়েন্দের সরকার – হিংস্রভাবে উৎখাত হয়। এই অভিজ্ঞতা কেবল রাজনৈতিক ট্রমা নয়, বরং বামপন্থার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত দ্বিধাও রেখে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আজকের প্রশ্নটি কোনো ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি নয়। এ এক অনুসন্ধান যে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি সুস্থায়ী হয়, এবং কখন তা বিপরীতমুখী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৭০–৭৩-এর পপুলার ইউনিটি সরকার এবং ২০২২–২৫-এর আপ্রুয়েবো দিগনিদাদ প্রশাসনের তুলনামূলক আলোচনা শুধুমাত্র স্মৃতিচারণ নয়; শ্রেণিশক্তির পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ার এক বিশ্লেষণী জানালা।
অনিবার্যতার কারণ দর্শানো বাদ দিয়ে
সালভাদোর আইয়েন্দের পতন নিয়ে বামপন্থী আলোচনায় গভীর স্থবিরতা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে এসেছে। একদল এই পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার দিকেই আঙুল তোলেন – সিআইএ-র হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক নাশকতা, ঠান্ডা যুদ্ধের ভূ-রাজনীতি। অন্যদল দায় চাপান স্বয়ং আইয়েন্দে সরকারের উপর। তাঁদের মতে অতিরিক্ত আইননিষ্ঠতা, সশস্ত্র প্রতিরোধে অনীহা, কিংবা বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি অতিরিক্ত আস্থা ছিল সর্বনাশের কারণ। এই দুই ব্যাখ্যা যুযুধান হলেও একটি বিষয়ে তারা একমত – চিলির সমাজতান্ত্রিক পথচলা শুরু থেকেই ভবিষ্যৎ ব্যর্থতার বীজ বহন করছিল।
‘অনিবার্যতা’র এই ধারণাই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক। আইয়েন্দের পরীক্ষানীরিক্ষাকে জন্মগতভাবেই ব্যর্থ ধরে নিলে, তার পরাজয় থেকে শেখার কিছু থাকে না – তা শুধুই এক সতর্কবার্তা হয়ে থেকে যায়। তখন ইতিহাস আর সম্ভাবনার ক্ষেত্র থাকে না, পড়ে থাকে এই ধারণা যে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্ভব। ইতিহাস যদিও এতটা যান্ত্রিক নিয়মে চলে না। কোনও রাজনৈতিক প্রকল্পের পরাজয় তার অন্তর্নিহিত অসম্ভাব্যতাকে প্রমাণ করে না; সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি-সমীকরণ একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে তার বিরুদ্ধে কীভাবে কাজ করেছে তা চিহ্নিত করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টিকে দেখলে, চিলির অভ্যুত্থান কেবল মার্কিন হস্তক্ষেপ বা সমাজতান্ত্রিক ভুলের ফসল হিসেবে দেখাটা যথেষ্ট নয়। বহিরাগত চাপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়েছিল তখনই, যখন দেশের অভ্যন্তরে শাসকশ্রেণির বিভক্ত অংশগুলি পুনরায় একত্রিত হতে পেরেছিল এবং মধ্যবিত্তের বড় অংশ তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। আইয়েন্দের সাংবিধানিক পথে অটল থাকা জনশক্তিকে মোটেই নিষ্ক্রিয় করেনি; তাঁর আমলেই শ্রমিক শ্রেণির সংগঠন, মজুরি বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস অভূতপূর্বভাবে বিস্তৃতি পেয়েছিল। আইয়েন্দের পতন সংস্কারবাদের কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক সংকট জোটের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হওয়া এবং সেই সুযোগ নিয়ে এলিটদের ঐক্যবদ্ধ আক্রমণ তাঁর সরকারের পতনের মূল কারণ।
পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র ও ব্যতিক্রমী চিলি
চিলির ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান কেবল বামপন্থী শক্তিকে দমন করেনি; তা পরিকল্পিতভাবে ভেঙে দিয়েছিল শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন, আর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করেছিল, যাতে ভবিষ্যতে সেই শক্তির অন্যতর পুনর্গঠনই অসম্ভব হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালে গণতন্ত্র ফিরে এলেও রাষ্ট্রের মৌল কাঠামো বদলায়নি। বাজারনির্ভর অর্থনীতি, বেসরকারিকরণ, খণ্ডিত শ্রমব্যবস্থা ও পুনর্বণ্টনে সাংবিধানিক বাধা – সবই আগের মতোই বহাল ছিল। ভোটাধিকার ফিরেছিল, কিন্তু শ্রেণিশক্তির বিন্যাসে বদল হয়নি।
প্রথম দুই দশক এই ব্যবস্থাটিকে কার্যকর বলেই মনে হয়েছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল, দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছিল, মধ্য-বাম সরকারগুলির পালাবদল একধরনের স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছিল। কিন্তু এই স্থিতিশীলতার নীচে জমছিল এক গভীর বৈপরীত্য। সামাজিক অধিকার ক্রমশ পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছিল; অনিশ্চয়তা হয়ে উঠছিল সাধারণ অভিজ্ঞতা; শ্রমিকশ্রেণি ক্রমেই বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত হয়ে পড়ছিল। ব্যবস্থার বৈধতা তখন থেকেই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, যদিও তার সংকট প্রকাশ পেতে সময় নেয়।
২০১৯ সালের বিদ্রোহ এই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ। কোনো আকস্মিক সামাজিক বিস্ফোরণ নয় তা, চলমান আর্থ-সামাজিক মডেলের বিরুদ্ধে অনাস্থা, যে মডেল মানুষকে জীবনযাপনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। গণভোট, সংবিধান রচনার প্রক্রিয়া এবং গাব্রিয়েল বরিচের নির্বাচন – সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, চিলি আবার সেই প্রশ্ন তুলছে যা ১৯৭৩ এ গায়ের জোরে বন্ধ করা হয়েছিল – বাজার-নির্ভরতা ছেড়ে, সামাজিক অধিকারের ভিত্তিতে কি গণতন্ত্র পুনর্গঠিত হতে পারে?
এই প্রচেষ্টার ব্যর্থতা – এবং তারপর দক্ষিণপন্থার দ্রুত উত্থান – ১৯৭০-এর দশকের ঘটনার এক উল্টো প্রতিধ্বনি। তখন শাসকশ্রেণি গণতন্ত্র ত্যাগ করেছিল কারণ সেই ব্যবস্থায় তাদের আধিপত্য অনিশ্চিত ছিল। আজ পরিস্থিতি উল্টো – গণতন্ত্রই অনেকের কাছে অর্থহীন হয়ে উঠেছে কারণ তা আর বস্তুগত নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এই বাস্তবতা বুঝতে গেলে আমাদের ক্ষমতার বিন্যাস, শ্রেণিসম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
চিলির সাম্প্রতিক ব্যর্থতা তাই অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয় বরং এমন এক কৌশলগত বিভ্রান্তির ফল, যেখানে সংস্কারের কর্মসূচি তার নিজস্ব সামাজিক ভিত্তির সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে। এখানেই পপুলার ইউনিটির সঙ্গে তুলনার তাৎপর্য। কারণটা এমন নয় যে আইয়েন্দে সমস্ত ‘সমাধান’ খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর প্রশ্নটিকে প্রধান বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন, তুলনাবিন্দুটি এইখানে।
বোঝা প্রয়োজন, গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথ কখন এবং কেন বন্ধ হয়ে যায়। চিলির অভিজ্ঞতা বলে, এই পথ বন্ধ হওয়া ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম নয় – রাজনৈতিক কৌশল ও শ্রেণি-সংঘাতের ফলাফল এবং ক্ষমতা-বিন্যাসের মধ্য দিয়ে তার গতি রূদ্ধ হয়ে যায়। আজকের সবচেয়ে জরুরি উপলব্ধি এইটি।
নব-উদারবাদী রূপান্তর ও সমাজের পুনর্গঠন
১৯৭৩-পরবর্তী চিলির সামাজিক রূপান্তরকে শুধুই দমন-পীড়নের ইতিহাস হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। সামরিক শাসনের নির্মমতা নিঃসন্দেহে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন ও বামপন্থী শক্তিকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, কিন্তু তার চেয়েও গভীর ছিল সমাজের কাঠামোগত পুনর্গঠন – যার মাধ্যমে মানুষের কাজ, ভোগ এবং দৈনন্দিন জীবনের ধরন আমূল বদলে দেওয়া হয়। ‘শিকাগো বয়েজ’-এর তত্ত্বাবধানে সামরিক-রাজ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ভেঙে দেয়, বেসরকারিকরণ ত্বরান্বিত করে, মুক্ত বাণিজ্য ও অর্থনীতির মডেল গড়ে তোলে এবং সামাজিক সুরক্ষার জায়গায় বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা চাপায়। শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে শিল্পভিত্তিক দরকষাকষি দুর্বল করা হয়, ক্ষেত্রীয় সংগঠন নিষিদ্ধ হয় এবং সংগঠিত শ্রম আন্দোলন কার্যত অপরাধে পরিণত হয়। পেনশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন – সব ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত দায় ও ঋণ-নির্ভরতা প্রাধান্য পায়। এর ফলে গড়ে ওঠে এমন এক সমাজ, যেখানে নাগরিক অধিকার নয় বরং বাজারে অংশগ্রহণের ক্ষমতাই জীবনের মান নির্ধারণ করে।
১৯৯০ সালে গণতন্ত্র ফিরে এলেও এই কাঠামো প্রায় অক্ষতই থেকে যায়। কনসের্তাসিওন এর নেতৃত্বে যে পালাবদল ঘটে, তার লক্ষ্য ছিল মূলত ১৯৭০-এর দশকের রাজনৈতিক মেরুকরণ এড়িয়ে, একটি সীমাবদ্ধ সংবিধানিক ব্যবস্থা ও নির্বাচনী কাঠামো এমনভাবে সাজানো – যাতে মৌলিক অর্থনৈতিক কাঠামো প্রশ্নের ঊর্ধে থাকে। মধ্য-বাম জোট ধীরে ধীরে নব-উদারনীতির মূল যুক্তিগুলো মেনে নেয় – সেগুলোকে ভেঙে ফেলার বদলে ‘মানবিক’ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিছু সময়ের জন্য এই কৌশল কার্যকরও মনে হয়েছিল। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ঘটে, দারিদ্র্যের হার কমে, এবং চিলি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ‘মডেল ছাত্র’ হিসেবে প্রশংসিত হয়। ভোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও ঋণের সহজলভ্যতা বহু মানুষের কাছে সামাজিক উন্নতির অনুভূতি তৈরি করে। গণতন্ত্র তখন কার্যত একটি শাসন-পরিবর্তনের যন্ত্রে পরিণত হয় – সামাজিক রূপান্তর না হয়ে তা নব-উদারবাদী ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় ।
তবে এই ভঙ্গুর স্থিতিশীলতায় দারিদ্র্য কমলেও শ্রমিক শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়ে। স্থায়ী শিল্প-ভিত্তিক কর্মসংস্থানের জায়গা নেয় চুক্তি-ভিত্তিক ও অ-নিরাপদ কাজ। শ্রমিক সংগঠনগুলো ভেঙে পড়ে, সংগঠনের শক্তি স্বয়ং ক্ষয় পেতে থাকে। একদিকে গড়ে ওঠে ঋণগ্রস্ত মধ্যবিত্ত, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থাকা এক বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী। ২০০০-এর দশকের গোড়াতেই এই ব্যবস্থার টানাপোড়েন স্পষ্ট হতে শুরু করে – রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা কমে, ভোটদানে অংশগ্রহণ হ্রাস পায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের প্রশ্নে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। কিন্তু সংগঠিত বিকল্পের অভাবে এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়ার আকারে।
যৌথ প্রতিরোধের প্রত্যাবর্তন
২০১০-এর দশকে জন-বয়ানের বদলকে দেখতে হবে ভিন্নভাবে। বৈষম্যের নতুন করে বৃদ্ধি ঘটেছিল এমন নয় বরং একে সমষ্টিগত প্রতিরোধের পুনরুত্থান বলে বর্ণনা করা যেতে পারে। ২০১১ সালের ছাত্র আন্দোলন ছিল মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন কেবল শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যমে চিলির সামাজিক মডেল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এই আন্দোলনই আবার গণ-বিক্ষোভকে নতুন করে রাজনৈতিক বৈধতা দেয় এবং এক প্রজন্ম উঠে আসে যারা কনসের্তাসিওনের নব্যউদারপন্থী আপসের বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করে।
এই জাগরণ ছাত্রসমাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী এক দশকে খনি-শ্রমিক, বন্দরকর্মী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী – বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রমজীবীরা একের পর এক আন্দোলনে নামেন। পরিবেশ ধ্বংস, বেসরকারিকৃত পেনশন ব্যবস্থা, লিঙ্গ-ভিত্তিক হিংসার বিরুদ্ধেও গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল বলে বিবেচিত শ্রমিকশ্রেণি নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও সংগঠিত শ্রমের বিস্তার সীমিত ছিল, তবু এই আন্দোলনগুলি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।
এই সংগ্রামগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ও অসমন্বিত – তা সত্ত্বেও তারা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বদল আনে। বহু বছর পর আবার সম্মিলিত রাজনৈতিক কর্মের অভ্যাস ফিরিয়ে আনে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যকে নগ্ন করে দেয় – যেখানে রাজনৈতিক অধিকার থাকলেও সামাজিক ন্যায় অনুপস্থিত।
এই প্রবণতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০১৯ সালের অক্টোবরে। মেট্রোর ভাড়া বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও আন্দোলন দ্রুতই রূপ নেয় এক বিস্তৃত গণবিদ্রোহে। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামেন, দৈনন্দিন জীবন-প্রবাহ স্তব্ধ হয়ে যায়, রাষ্ট্রের দমননীতি চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়। এর পরের বছর অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নতুন সংবিধান রচনার পক্ষে রায় আসে, এই ক্ষোভ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। স্বৈরতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের প্রতি এক প্রকাশ্য গণ-অস্বীকৃতি ছিল এই ফলাফল।
এই পর্যায়ে পরিস্থিতি ভিন্ন পথে মোড় নিতে পারত। বিদ্রোহ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেনি, কিন্তু ক্ষমতার ভিত্তিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া সেই অসন্তোষকে কাঠামোগত রূপ দেওয়ার সুযোগ এনে দেয়। বাম ও স্বতন্ত্র শক্তির প্রাধান্যে গঠিত সাংবিধানিক সভা সেই সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে শুরু থেকেই সমস্যার ইঙ্গিত ছিল। আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা ছিল বিচিত্র, আলগাভাবে সংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির প্রতি সন্দিহান। অপরদিকে, ফ্রেন্তে আম্প্লিও ও পরে কমিউনিস্ট পার্টি দ্রুত সেই শূন্যস্থান দখল করে – যা রাজনৈতিকভাবে অনিবার্য হলেও এর ফলে আন্দোলনের প্রাণশক্তি দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সংবিধান সভা ক্রমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সুদূরপ্রসারী – সামাজিক অধিকার, বহুজাতিক স্বীকৃতি, লিঙ্গসমতা, পরিবেশ সুরক্ষা। কিন্তু তার কার্যপ্রণালী ছিল খণ্ডিত ও অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। শ্রম, মজুরি, কর্মসংস্থান বা জীবিকার নিরাপত্তার প্রশ্নে সুস্পষ্ট দিশা না থাকায়, বহু সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রস্তাবিত সংবিধান এক ধরনের নৈতিক ঘোষণাপত্রে পরিণত হয় – আকর্ষণীয় কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে সংযোগহীন।
এই প্রেক্ষাপটেই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গাব্রিয়েল বোরিচের নির্বাচন ঘটে। তাঁর জয় ছিল বাস্তব, কিন্তু ভঙ্গুর। তিনি ক্ষমতায় আসেন প্রথম পর্বের সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সুবাদে এবং দ্বিতীয় দফায় মূলত দক্ষিণপন্থাকে ঠেকানোর জন্য গঠিত জোটের ওপর নির্ভর করে, সংসদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই। আইয়েন্দের মতো তিনি কোনো শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের উপর ভর করে ক্ষমতায় আসেননি। ফলে শুরু থেকেই তাঁর সরকার তীব্র সীমাবদ্ধতায় ভুগতে থাকে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলি কেবল কাঠামোগত নয়, কৌশলগতও ছিল। সরকার ধরে নিয়েছিল যে সংবিধান সংস্কারই রাজনৈতিক বৈধতার মূল উৎস হবে এবং সংযমী প্রশাসন বাজারকে আশ্বস্ত করবে। কিন্তু উভয় অনুমানই ভুল প্রমাণিত হয়। ২০২২ সালে সংবিধান প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে সঙ্গে সরকার তার নৈতিক জোর হারায়; একই সঙ্গে ব্যবসায়িক মহলের সঙ্গে আপস করেও তাদের সমর্থন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। সংগঠিত সামাজিক শক্তির অভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা ক্রমে শূন্য হয়ে পড়ে।
ফলত যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয় তা পূরণ করে কট্টর দক্ষিণপন্থা। বিদ্রোহ শুধু দমন-পীড়ন নয় – ক্লান্তি, বিভ্রান্তি ও কৌশলগত শূন্যতার মধ্য দিয়ে তার শক্তি নিঃশেষ করে ফেলে। যে শূন্যতা তৈরি হয় সেখানে প্রবেশ করে এক নতুন কর্তৃত্ববাদী প্রকল্প, যা নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ভাষায় নিজের আধিপত্য কায়েম করতে চায়।
অভিজ্ঞতার সার এক কঠিন সত্য। গণতান্ত্রিক সংস্কার তখনই টিকে থাকে যখন তা সামাজিক ক্ষমতার বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রতিষ্ঠান, সংবিধান বা নির্বাচন – এগুলোর কোনওটিই নিজে নিজে যথেষ্ট নয়। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে না পারলে, গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত শাসনের কৌশলে পর্যবসিত হয়। চিলির অভিজ্ঞতা আমাদের সেই পুরোনো কিন্তু প্রাসঙ্গিক সত্যের মুখোমুখি করে – সমাজ বদলাতে হলে শুধু রাষ্ট্র নয়, সমাজকেও বদলাতে হয়।
পপুলার ইউনিটির অভিজ্ঞতা: ক্ষমতা, সীমা ও সম্ভাবনার প্রশ্ন
চিলির পপুলার ইউনিটি সরকারকে নতুন করে বিচার করা জরুরি – একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবে নয়, বরং রূপান্তরের রাজনীতির সীমা ও সম্ভাবনাকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে। সংসদীয় পথে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের যে সবচেয়ে সুসংহত ও সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টা বিংশ শতাব্দীতে দেখা গিয়েছিল, আইয়েন্দের সরকার ছিল তারই উদাহরণ। তার পরাজয় বাস্তব ঘটনা। কিন্তু পরাজয় মানেই যে সেই পথ অবাস্তব বা ভ্রান্ত – এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ইতিহাসের সাথে সুবিচার নয়। প্রশ্ন হলো – কীভাবে এবং কোন মুহূর্তে শক্তির ভারসাম্য নির্ণায়কভাবে পাল্টে গেল?
এই প্রশ্নকে ঘিরে দুই ধরনের ব্যাখ্যার কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। ব্যর্থতার কারণের অতি-সরলীকরণ – বাহ্যিক শক্তির ষড়যন্ত্র বা আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা। বাস্তবে যা ঘটেছিল, তা ছিল অনেক বেশি জটিল। মার্কিন হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে নাশকতামূলক ছিল। অর্থনৈতিক অবরোধ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, সামরিক প্ররোচনা সবই ঘটেছে। একইসাথে এটাও সত্য যে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার আইয়েন্দের নির্বাচন, শপথগ্রহণ এবং প্রাথমিক সংস্কার রুখতে ব্যর্থ হয়েছিল। এমনকি জেনারেল রেনে শ্নাইডার-অপহরণ প্রচেষ্টাও উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছিল। প্রকৃতপক্ষে বহিরাগত চাপ তখনই কার্যকর হতে পারে যখন দেশের ভেতরের শ্রেণি-সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে সেই চাপকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়। অর্থনৈতিক অবরোধ তখন রাজনৈতিক রূপ নেয় – মুদ্রাস্ফীতি, ঘাটতি ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত ও দোদুল্যমান শ্রেণি-গুলিকে বিচলিত করে তোলে।
এখানেই আসল প্রশ্ন। আইয়েন্দের সরকার কি খুব বেশি সংস্কার করেছিল? নাকি খুব কম? বিপ্লবী বামপন্থীরা প্রায়শই বলেন, আইয়েন্দে সাংবিধানিকতার মোহে আটকে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ নেননি। এই সমালোচনার ভিতরে একটি ভ্রান্ত অনুমান আছে – যেন সেই সময়ে সশস্ত্র বিপ্লব বাস্তবসম্মত ও জনসমর্থনসমৃদ্ধ ছিল। বাস্তবে আইয়েন্দে ক্ষমতায় এসেছিলেন দীর্ঘ নির্বাচনী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, এমন এক সমাজে যেখানে আইনের প্রতি আস্থা গভীর, শক্তিশালী মধ্যবিত্ত, এবং সেনাবাহিনী তখনও সাংবিধানিক আনুগত্যের উপর জোর দিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পপুলার ইউনিটি অবিলম্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেনি। তাদের লক্ষ্য ছিল উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ, বহুজাতিক ও একচেটিয়া পুঁজির দখল ভাঙা এবং শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব জীবনমান উন্নত করা। সমাজতন্ত্র ছিল একটি প্রক্রিয়া – গন্তব্য নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, সরকারের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩ সালের মধ্যে তামা, ব্যাঙ্কিং, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত হয়। জাতীয় উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে। ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে ভূস্বামী শ্রেণির ভিত্তি ভেঙে ফেলা হয়। প্রকৃত মজুরি বাড়ে, বেকারত্ব ঐতিহাসিকভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণির সংগঠিত শক্তিও প্রসার লাভ করে। ইউনিয়ন সদস্যসংখ্যা বাড়ে, কারখানা পরিষদ, পাড়া-ভিত্তিক কমিটি ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। শ্রমিকরা শুধুমাত্র সুবিধাভোগী ছিলেন না – তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠেছিলেন। সুতরাং ‘অতিরিক্ত আইনী সংযম’-এর অভিযোগ আসলে বিভ্রান্তিকর। সরকার খুব কম এগিয়েছিল এমন নয় বরং অগ্রগতি এত দ্রুত ঘটছিল যে তা বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছিল।
এইখানেই পপুলার ইউনিটির প্রকৃত সংকট নিহিত ছিল। সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের মৌলিক দ্বন্দ্বটি হলো – শ্রমজীবী মানুষের ক্ষমতা যত বাড়ে, বিদ্যমান সামাজিক কাঠামো ততটাই অস্থির হয়ে ওঠে। যদি সেই রূপান্তর এমন গতিতে ঘটে যে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠার আগেই পুরনো শাসকগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়, তবে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। প্রথম কয়েক বছরে আইয়েন্দে সরকার এই ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছিল। নির্বাচনে সমর্থন বাড়ছিল, বিরোধীরা বিভক্ত ছিল, মধ্যবিত্ত তখনো পুরোপুরি বিপক্ষে যায়নি, সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবিধানিক অবস্থানে ছিল।
কিন্তু ১৯৭২ সালের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক চাপ তীব্র হয়, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন। অর্থনৈতিক সংকট, মজুরি হ্রাস, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। শ্রমিকরা তখনও সরকারকে সমর্থন করছিল কিন্তু সামাজিক মেরুকরণ তীব্র হচ্ছিল। এই অবস্থায় আইয়েন্দে এক ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু যৌক্তিক কৌশল নেন – খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটদের বাম অংশের সঙ্গে সমঝোতা গড়ে তোলা।
এই কৌশলকে অনেকেই আজ অ-বিবেচনাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দেন। বাস্তবে কিন্তু তাই ছিল শক্তির ভারসাম্য বিবেচনা করে নেওয়ার মত একমাত্র পথ। খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটদের ভেতরে একটি অংশ ছিল ভূমি সংস্কার ও রাষ্ট্রায়ত্তকরণের পক্ষে। তাদের সঙ্গে জোট গড়ে উঠলে অভিজাতদের ঐক্য ভাঙা যেত। কিন্তু এই উদ্যোগ দুই দিক থেকে ব্যর্থ হয়। একদিকে, মধ্যপন্থী নেতৃত্ব দক্ষিণ দিকে ঝুঁকে পড়ে; অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক শিবিরের একটি অংশ আপাত-আপসকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছিল। ফলাফল – রাজনৈতিক অচলাবস্থা, দ্রুত মেরুকরণ এবং শেষ পর্যন্ত সেনা-অভ্যুত্থান।
এই অভিজ্ঞতার সারবস্তু কী তবে? সংস্কার অসম্ভব নয় বা বিপ্লবও অনিবার্য নয়। রূপান্তরের রাজনীতি সর্বদা ভারসাম্যের নীতি নির্ভর, যেখানে খুব ধীরে এগোলে শ্রমিক সেনি হতাশ হয়, আর খুব দ্রুত এগোলে প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়, কিন্তু তার বিকল্পও নেই।
আইয়েন্দের পরাজয় কোনো ঐতিহাসিক নিয়তির ফল নয়; নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিণতি। আজও এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে তোলার পদ্ধতির উপর – শুধুমাত্র নৈতিক শুদ্ধতার উপর নয়।
চিলির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাকে এই আলোয় দেখলে বুঝতে সুবিধা। আইয়েন্দে কোথায় ভুল করেছিলেন – এর চেয়েও বড় প্রশ্ন আজকের বামপন্থা কি সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে এমন কোন কৌশল ভাবতে পেরেছে যা শ্রমিক শ্রেণির সামাজিক শক্তিকে সংগঠিত করবে, শুধু নৈতিক উচ্চতায় নয়, বাস্তব ক্ষমতা অর্জনের সাপেক্ষেও।
নতুন বাম ও ক্ষমতার প্রশ্ন
২০২২ সালের মার্চে গাব্রিয়েল বরিচ ক্ষমতায় আসার সময় চিলিতে যেন এক নতুন ঐতিহাসিক মুহূর্তের সূচনা ঘটেছিল। এক দশকের টানা আন্দোলন – যার চূড়ান্ত প্রকাশ ২০১৯ সালের গণবিদ্রোহ – উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত দেশের নব্য-উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থার বৈধতাকে গভীরভাবে নড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৯০-এর পর থেকে যে দলীয় ব্যবস্থা দেশ শাসন করে এসেছে, তার ভিত্তি ভেঙে পড়েছিল। বামপন্থী ও স্বতন্ত্র প্রতিনিধিদের প্রাধান্যে গঠিত সাংবিধানিক পরিষদ নতুন সংবিধান রচনায় ব্যস্ত ছিল। শিল্পপতি ও কর্পোরেট স্বার্থগোষ্ঠী তখন বিভক্ত ও আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে। শ্রমজীবী শ্রেণি ঐতিহাসিক অর্থে তখনও দুর্বল, তবু খনি, বন্দর ও সরকারি পরিষেবার মতো কৌশলগত ক্ষেত্রে তারা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছিলেন। ১৯৭৩ সালের পর প্রথম এমন অনুকূল রাজনৈতিক ক্ষণ উপস্থিত হয়েছিল।
কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই সেই সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। নতুন সংবিধান গণভোটে পরাজিত হল। প্রস্তাবিত সংস্কারগুলি হয় স্থগিত, নয় দুর্বল হয়ে পড়ল। রাজনৈতিক ভারসাম্য দ্রুত দক্ষিণ দিকে সরে গেল—এমনকি এক কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠলো । ১৯৭৩-র মতো ট্যাঙ্ক নামাতে হয়নি; এইবার ব্যালটই যথেষ্ট ছিল।
এই পরিণতি শুধু ‘প্রতিকূল পরিস্থিতি’র ফল নয়। এক সচেতন কৌশলগত পন্থারও ফল, যে পন্থা শুরু থেকেই বোরিচ সরকারের পথ নির্ধারণ করেছিল। সামাজিক চাপকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার বদলে সরকার বেছে নেয় ধাপে ধাপে সংস্কারের পথ—আগে সংবিধান, পরে বণ্টনমূলক পরিবর্তন। গণআন্দোলনকে শক্তির উৎস হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
দ্রুত এর ফল স্পষ্ট হয়ে যায়। বাস্তব অর্থনৈতিক সংস্কার স্থগিত রেখে নয়া সংবিধান রচনার বিমূর্ততা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান সুফল পৌঁছাতে পারেনি। পুঁজিপতি শ্রেণি পুনর্গঠনের সময় পেয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন ও সামাজিক আন্দোলনগুলো অনুভব করেছে যে নীতিনির্ধারণে তাদের ভূমিকা ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ছে। প্রতিবাদ কমেছে—শুধু অতিমারির কারণে নয়, রাষ্ট্রও আর এমন কোন পথ খোলা রাখেনি যেখানে সামাজিক চাপ নীতিতে রূপ নিতে পারে।
এরপরই রাজনীতির গতি বদলে যায়। মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগহীনতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা বাস্তব সমস্যা হলেও, সেগুলিকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে মোকাবিলা করার বদলে শাসকগোষ্ঠী সেগুলিকে ‘অপরিহার্য বাস্তবতা’ হিসেবে মেনে নেয়। আইয়েন্দে সরকারের মতো পুঁজির ক্ষমতা খর্ব করার বদলে, বোরিচ প্রশাসন ধীরে ধীরে আপসের পথ বেছে নেয়। শ্রম সংস্কার দুর্বল হয়, পেনশন সংস্কার স্থগিত থাকে, আর রাজস্ব সংস্কার পিছিয়ে যায়—এই আশায় যে এতে অভিজাত শ্রেণির সমর্থন পাওয়া যাবে।
ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রকৃত মজুরি স্থবির থাকে, অনিশ্চয়তা বাড়ে, আর সরকারের ভাষা এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে ফারাক গভীরতর হতে থাকে। এই শূন্যস্থানেই দক্ষিণপন্থীরা নিজেদের পুনর্গঠিত করে—‘শৃঙ্খলা’, ‘স্থিতিশীলতা’ ও ‘বাস্তববাদ’-এর নামে তারা নিজেদের একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে।
এই প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই হয়ে ওঠে সংকটের প্রতীক। ২০২২ সালের গণভোটে এই দূরত্বই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষ সংস্কারের বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি; তারা প্রত্যাখ্যান করেছে এমন এক প্রকল্পকে, যা তাদের জীবনে বাস্তব নিরাপত্তা এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরাজয় সরকারের নৈতিক কর্তৃত্ব ভেঙে দেয় এবং অচিরেই চরম দক্ষিণপন্থী শক্তিকে রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরিয়ে আনে।
১৯৭৩ সালের সঙ্গে পার্থক্য এখানেই। তখন অভিজাতরা গণতন্ত্র ত্যাগ করেছিল কারণ তা আর তাদের স্বার্থ রক্ষা করছিল না। আজ তারা পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেছে, কারণ গণতন্ত্র শ্রমজীবী মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পার্থক্য বোঝা জরুরি।
দুই সুবিধাজনক মিথ
চিলির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ঘিরে যে ব্যাখ্যাগুলি সর্বাধিক প্রচলিত, তার মধ্যে দুটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। প্রথমটি হলো ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার’ মিথ— প্রগতিশীল সংবিধান, আলোকিত নেতৃত্ব এবং প্রক্রিয়াগত গণতন্ত্রই যথেষ্ট একটি সমাজের কাঠামোগত বদলের জন্য। ২০১৯–এর পর চিলির অভিজ্ঞতা এই বিশ্বাসকে স্পষ্টভাবেই অস্বীকার করেছে। সামাজিক শক্তির সক্রিয় সমর্থন ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সুস্থায়ী হয় না; বিপরীতে, খুব দ্রুতই পুরোনো পরিস্থিতির প্রত্যাবর্তন সম্ভাবনা দেখা দেয় ।
দ্বিতীয় মিথটি হলো ‘অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ার তত্ত্ব’—এই ধারণা যে যেকোনো প্রকৃত সংস্কার অবশ্যম্ভাবীভাবে কর্তৃত্ববাদী প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে, এবং তাই ১৯৭৩ বা সাম্প্রতিক দক্ষিণপন্থী প্রত্যাবর্তনকে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই মেনে নিতে হবে। বাস্তবতা এত সরল নয় অবশ্য । ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে প্রতিক্রিয়া আসে তখনই, যখন ক্ষমতার ভারসাম্য একদিকে ঝুঁকে পড়ে—যখন সংস্কার হয়, কিন্তু সেই সংস্কারকে রক্ষা করার মতো সামাজিক শক্তি গড়ে ওঠে না।
এই দুই ভ্রান্ত ধারণার বেড়া পেরিয়ে ইতিহাসে চোখ রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, চিলির দুই ভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে—আইয়েন্দের সময় ও সাম্প্রতিক বাম সরকারের আমলে—ফলাফলের পার্থক্য নির্ধারিত হয়েছে মূলত যে প্রশ্নে – ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা সরকারগুলো জন-শক্তিকে কোন মাত্রায় বিস্তৃত ও সংহত করতে পেরেছে। যেখানে শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত শক্তি বেড়েছে, সেখানে সংস্কার সামাজিক ভিত্তি পেয়েছে; আর যেখানে সেই শক্তি দুর্বল থেকেছে বা ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, সেখানে সংস্কারও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
সেদিক থেকে দেখলে, পপুলার ইউনিটি সরকারের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সে সময় বাস্তব মজুরি বৃদ্ধি, ইউনিয়ন বিস্তার ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ শ্রমজীবী শ্রেণির অবস্থানকে বাস্তব অর্থে শক্তিশালী করেছিল—যা শাসকশ্রেণির তীব্র প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে। বিপরীতে, সাম্প্রতিক কালে সংস্কার এগিয়েছে এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণি দুর্বল, দরকষাকষির ক্ষমতা সীমিত এবং সামাজিক শক্তি ছিন্নভিন্ন। ফলে সংস্কারগুলো কাগজে প্রগতিশীল হলেও বাস্তবে ভরহীন থেকে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণপন্থার উত্থান আচমকা কিছু নয়। এ সেই শূন্যতার ফল, সংস্কার বাস্তব উন্নতিতে রূপান্তরিত হতে না পারার শূন্যতা । শ্রমজীবী মানুষের অভিজ্ঞতায় যখন নিরাপত্তা ও মর্যাদা বলে কিছুই থাকে না, তখন তারা সহজেই এমন শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে যারা অন্তত শৃঙ্খলা ও স্থিতির প্রতিশ্রুতি দেয়— বিনিময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচন শ্রমজীবীর কাছে অবান্তর হয়ে যায়।
কোনো একক ভুল বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার কারণে সাম্প্রতিক সংস্কার প্রকল্প ভেঙে পড়েনি। গভীর কাঠামোগত দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে: এমন একটি রাষ্ট্রে সংস্কার সাধনের চেষ্টা, যেখানে অর্থনৈতিক ক্ষমতা, শ্রেণিস্বার্থ ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রগুলো রাজনীতির বাইরে রয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক সংস্কার যতই উচ্চাভিলাষী হোক না কেন, যদি তা সামাজিক শক্তির পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা অচিরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সংসদীয় সংস্কার ও তাঁর সীমাবদ্ধতা
চিলির অভিজ্ঞতা কোনো ব্যতিক্রম নয়— লাতিন আমেরিকা ও বিশ্বব্যাপী বামপন্থী রাজনীতির একটি সাধারণ সংকট। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করাই যদি কৌশলের শেষ কথা হয়, তবে সেই ক্ষমতা দ্রুতই ফাঁপা হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক বৈধতায় তখন আর জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে না, নির্বাচনী চক্রের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি থেকে তার উৎসারণ ঘটে। এর ফল রাজনৈতিক ক্লান্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পুনরুত্থান।
চিলির ক্ষেত্রে এই সংকট আরও স্পষ্ট, কারণ এখানে নব-উদারবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বাস্তবেই সংঘটিত হয়েছিল। ২০১৯ সালের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছিল যে সামাজিক ক্ষোভ কেবল সাংস্কৃতিক নয়, বস্তুগত—মজুরি, কাজের নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনের সামগ্রিক অনিশ্চয়তা বিরুদ্ধে । কিন্তু সেই ক্ষোভকে স্থায়ী সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তরিত করার কাজটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়া সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি; বরং ধীরে ধীরে তা আন্দোলনের শক্তিকে নিজের ভেতরে শুষে নিয়ে নিস্তেজ করে ফেলেছে।
গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র কোনো নৈতিক অবস্থান বা নির্বাচনী কৌশলমাত্র নয়; এটি ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী শ্রেণির সংগঠন, সংগ্রাম এবং আত্মনির্ভরশীলতা কেবল সহায়ক নয়, অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় সংস্কারের স্থায়িত্ব নির্ভর করে সামাজিক শক্তির স্থায়ী চাপের উপর ।
প্রশ্নটি এখন আর এখানে দাঁড়িয়ে নেই যে সংসদীয় পথ গ্রহণ করা উচিত কি না। এই পথকে কীভাবে সামাজিক শক্তির বিস্তৃত ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সেটাই প্রশ্ন। যদি সেই সংযোগ না ঘটে, তবে সবচেয়ে প্রগতিশীল সংবিধানও দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং সবচেয়ে উদার সরকারও শেষ পর্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির জন্য পথ প্রশস্ত করে।
চিলির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা কোনো ব্যতিক্রম নয়, সতর্কবার্তা। সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর কেবল নীতিনির্ধারণ বা নির্বাচনী জয়ের প্রশ্ন নয়; এটি শক্তির ভারসাম্য বদলের প্রশ্ন। সেই ভারসাম্য গড়ে ওঠে দীর্ঘ সংগ্রামে, সংগঠনের মধ্য দিয়ে এবং রাজনৈতিক কল্পনাশক্তির সঙ্গে বাস্তব সামাজিক শক্তির সংযোগে। এই পাঠ উপেক্ষা করলে, ইতিহাস নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করতে পারে—ভিন্ন রূপে, কিন্তু একই পরিণতিতে। আজকের বামপন্থা কি এই শিক্ষা থেকে সত্যিই কৌশলগত কিছু শিখতে পারছে?
তথ্যসূত্র
- Pablo Stefanoni, ¿La rebelión se volvió de derecha? Buenos Aires: Siglo XXI, 2021
- V-Dem Institute, Nord, Marina, Martin Lundstedt, David Altman, Fabio Angiolillo, Cecilia Borella, Tiago.
- Michael Roberts, “Chile: Another Turn to the Right,” The Next Recession, November 16, 2025.
- International Crisis Group, Chile’s Constitutional Reckoning, Latin America Briefing No. 62, 29 August 2022
- Kenneth M. Roberts, “Chile’s Party System Collapse and the Challenge of Democratic Representation,” Latin American Politics and Society 64, no. 3 (2022).
- National Security Archive, Chile and the United States: Declassified Documents, George Washington University.
- Peter Kornbluh, The Pinochet File, The New Press, 2003.
- Carlos Ruiz Encina De nuevo la sociedad;
- UNDP এর চিলি সংক্রান্ত রিপোর্ট
- Manuel Gárate Chateau, La Revolución Capitalista de Chile
- Peter Winn, Weavers of Revolution (Oxford: Oxford University Press, 1986)
- Ricardo Ffrench-Davis, Economic Reforms in Chile (London: Palgrave, 2002).
- Instituto Nacional de Estadísticas (INE), Índice de Remuneraciones Reales, Chile, 2022–23.
( লেখাটি ইতিপূর্বে অনীক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে )
Editorial Board Member of Alternative Viewpoint
