২০২৫ এ ভারতবর্ষ আবার নতুন এক রাজনৈতিক ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলার সীমান্ত জেলাগুলি থেকে হিংসা পীড়িত মনিপুর অবধি এখন পর্যন্ত ১২টি রাজ্যে প্রচুর পরিমাণ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করে যে বিরাট উদ্যোগ শুরু হয়েছে তার সরকারি নাম ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন।’ সরল দৃষ্টিতে তাকালে একে একটি নির্দোষ প্রক্রিয়া বলেই মনে হওয়ার কথা। ভোটার তালিকা ঝাড়াই বাছাই, নতুন ভোটারের অন্তর্ভুক্তি, ঠিকানা এবং ছবি আপডেট করা, ডুপ্লিকেট এন্ট্রিগুলিকে বাতিল করা ইত্যাদি সহ, তালিকা এবং সংখ্যা নিয়ে ভারত রাষ্ট্রের যে দীর্ঘকালীন ঐতিহাসিক উন্মাদনা একে প্রাথমিক দৃষ্টিতে তারই একটি প্রশাসনিক কার্যক্রমগত সম্প্রসারণ বলে মনে হয়।
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করেছে এবারের SIR প্রক্রিয়ার কোনকিছুই রুটিন কার্যক্রম নয়। এর তথ্য-সংযোজনের ব্যাপ্তি, সময়, নির্ঘন্ট, ভৌগোলিক অঞ্চল নির্বাচন, বিভিন্ন অস্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব, ভোটার এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ককে, স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথমবার, একেবারে ভিন্নধাঁচে বিচ্যুত করতে চাইছে। ভারত রাষ্ট্র নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে – শুধুমাত্র কারা ভোট দেবেন তাই নয়, রাজনৈতিক অধিকারসম্পন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেই তাঁরা আদৌ অন্তর্ভুক্ত হবেন কিনা।
SIR সম্পর্কিত সরকারি তথ্য-ভাষা যত না বলে তার চেয়ে অনেক বেশি গোপন করে। এমনিতে বর্তমানে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন প্রতি বছর ভোটার তালিকার সংশোধন করে এবং ২০২৪-২৫ এও একটি কম্প্রিহেন্সিভ আপডেশনের এর কাজ সারা ভারত জুড়েই সম্পন্ন হয়েছে। তারপরেও ২০২৫-২৬-এ এই SIR এবং এর নামে যা শুরু হল, তা সম্পূর্ণই একটি অন্য স্তরে, মাত্রায় এবং ব্যাপ্তির দিকে চলে গেল। বোঝা যায় এটা একটা সাধারণ ভোটের ঘর গোছানোর কাজ নয় বরং নিগুঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে কয়েকটি রাজ্যকে বেছে বেছে এর আওতায় আনা হলো যেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে গভীর বিরোধিতা আছে বা ভবিষ্যতে বিরোধিতা ঘনীভূত হয়ে ওঠার রাজনৈতিক সম্ভাবনা আছে। এই ভূগোলের কেন্দ্রে আছে পশ্চিমবঙ্গ, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং কর্ণাটক। আসামে এনআরসি করে আগেই বহু মানুষের বেনাগরিকীকরণ হয়েছে। নাগাল্যান্ড এবং মনিপুর এই ভূগোলের সীমান্ত। মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং উত্তরপ্রদেশকে বলা যায়, এই প্রকল্পের ‘নিরপেক্ষ মুখ’ (facade of neutrality)। বেছে নেওয়ার ধরন কোনভাবেই সমাপতনিক নয় বরং যথেষ্ট উদ্দেশ্যপূর্ণ।
নির্বাচনী তালিকার সুষ্ঠু রূপায়ণকে উদ্দেশ্য হিসেবে উপস্থাপন করলেও ইতিমধ্যে বিহার এবং আসামে (NRC) আমরা ব্যাপক পরিমাণে সংখ্যালঘু, পরিযায়ী, শহুরে ভাড়াটিয়া স্থানান্তরিত শ্রমজীবী, অনিশ্চিত পেশায় থাকা মানুষজন এবং মহিলাদের নাম বাদ পড়তে দেখেছি। এর মধ্যে এমনিতে একটা পরিচিত নকশা আছে। ভারতীয় আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং তাতে মিলে থাকা কর্তৃত্ত্ববাদী প্রবণতা। যেকোনো ভোটার তালিকা সংশোধনেই প্রান্তিকায়িত মানুষজনকে বৈষম্যমূলকভাবে টানাপোড়েনে পড়তে হয়। কিন্তু SIR এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল এর ব্যাপক মাত্রা এবং রাজনৈতিক অসদুদ্দেশ্য। এই মাত্রার বর্জন-প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জড়ত্বের বাইরে গভীর এক ধরনের অন্যরকম রাজনৈতিক উচ্চাশার উপস্থিতি জানান দেয়, আরো কোন বৃহৎ প্রকল্পের প্রশাসনিক অস্ত্র হিসাবে SIR এর উদ্ভব–উদ্দেশ্য এমন এক ধরনের নির্বাচকমণ্ডলীর নির্মাণ যা মতাদর্শগতভাবে এবং নির্বাচনী উপযোগের দিক থেকেও হিন্দুত্ববাদী শাসন কাঠামোর বাসনাকে প্রতিফলিত করবে।
ফ্যাসিবাদী রূপান্তরের নকশা : আমলাতন্ত্রের ব্যবহার
আধুনিক কর্তৃত্ববাদ সবসময় উচ্চকিত ঘোষণায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে না। সাধারণত তা বেছে নেয় পদ্ধতিগত, পরিসংখ্যানগত এবং প্রশাসনগত যাত্রাপথ। ভারতের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা এই বিষয়ে সুবিধে করে দিয়ে গেছে। জনগণনা মানুষের ‘প্রবহমান পরিচিতি’র (fluid identities) শ্রেণিকরণ করেছে। সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি ‘আত্মীয়তার কাঠামোগুলিকে (kinship structure) স্থিরীকৃত করেছে। পুলিশি-সার্ভের দ্বারা ম্যাপিং করে “অপরাধী জনগোষ্ঠী” (criminal tribe) এর উদ্ভব ঘটিয়েছে। স্বাধীন ভারতীয় রাষ্ট্র শুধু এই ধরনের কল্পনা – পদ্ধতিগুলির আত্তীকরণ করেছে তাই নয়, এই কল্পনাগুলোকে রূপ দেওয়া আমলাতান্ত্রিকতার শিকড়টিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। ফলত বর্তমান সময়ে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনৈতিক প্রকল্পে এই প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বিপুল পুনর্গঠন চলছে।
SIR উদাহরণ, যে কিভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠতে পারে বর্জনের হাতিয়ার। ‘ভেরিফিকেশনের’ ছদ্মনামে লক্ষ লক্ষ ভোটার -গরিব, যুবক, স্থানান্তরিত এবং অ-নথিবদ্ধ মানুষকে বাসস্থান, পরিচিতি এবং নাগরিক যোগ্যতার প্রমাণপত্র দাখিল করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোনো বিপর্যয়ে হারিয়ে যাওয়া একটা ‘ভাড়ার চুক্তিপত্র’ ( rental agreement) একটা ভোট অধিকারকে বিনষ্ট করতে পারে, একটা বানান-ভুল তালিকা থেকে বাদ পড়া নিশ্চিত করতে পারে, বিয়ের পরে পদবী বদলের কারণে মহিলাদের, উচ্ছেদ বা চাকরি হারানোর ফলে স্থানান্তরিত শ্রমজীবীদের অথবা অন্যত্র হোস্টেলে পাঠরত শিক্ষার্থীদের এই বর্জন-সন্ত্রাসের আবহে অস্থির দিনযাপনে বাধ্য হতে হচ্ছে। প্রমাণ দাখিল করার বোঝাটা পুরোটাই নাগরিকের ঘাড়ে, অন্যদিকে কোন আইনী যাচাই ব্যতিরেকেই এই সমস্ত কর্মপদ্ধতির মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের পরিসীমা ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।
এই ধরনের প্রবণতার একটি আন্তর্জাতিক নকশা আমরা দেখেছি। তুরস্কে এরদোগান, হাঙ্গেরিতে ভিক্টর ওরবান, ব্রাজিলে বোলসেনারো উদ্দেশ্য-প্রণোদিত ভোটাধিকার বর্জনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছে, ‘ভোটার লিস্ট পরিষ্কার’ এর আখ্যান মানুষকে গিলিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালো মানুষ, অভিবাসী শ্রমজীবীদের দমিয়ে রাখতে রিপাবলিকান সরকারগুলো বিভিন্ন প্রদেশে ‘purge’ এবং ‘আইডি রিকোয়ারমেন্ট’কে ব্যবহার করেছে। ভারতের SIR ঠিক অনুকরণ নয় বরং বিশ্বায়িত কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতিগুলোর এক ধরনের দেশীয় প্রশাসনিক রূপ। জাতপাত, সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের সাথে নিখুঁত অনুপাতে আমলাতান্ত্রিক অতি-প্রয়োগকে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশী ‘ভূত’ : নির্বাচনী তালিকার সাম্প্রদায়িকীকরণ
কারোরই অজানা নয়, যে কোন কর্তৃত্ববাদী প্রকল্প একটি আভ্যন্তরীণ ‘শত্রু’’নির্মাণ করতে চায়। SIR এর ক্ষেত্রে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সেই উদ্দেশ্য পূরণ করছে। পশ্চিমবঙ্গ বা আসামে দীর্ঘদিন ধরে মুসলমান জনসংখ্যাকে এই আখ্যায় ভূষিত করা হয়েছে। অথচ তাঁদের শিকড় ওইসব অঞ্চলে দেশভাগের অনেক আগে থেকেই গ্রথিত। এই জনসংখ্যাকে একটি সমসাময়িক মিথ্যে কল্পনার মধ্যে দিয়ে ‘ডেমোগ্রাফিক হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ‘মুসলমান মাত্রই সন্দেহজনক’ এই ন্যারেটিভ তাঁদের আইনি বৈধতা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিপদ-সঙ্কুল করে তোলে এবং এমন সমস্ত প্রমাণপত্র দাখিল করতে বলা হয় অনেক সময়ই দরিদ্র পরিবারগুলির সেসব ডকুমেন্ট থাকেনা। ‘অনুপ্রবেশ’ এক মিথ্যা কয়েনেজ যা দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের নির্বাচনী প্রয়োজনে ব্যবহার করে এসেছে। তাকে শৈল্পিক-স্তরে উন্নীত করেছে বিজেপি নেতৃত্ব এবং গদি-মিডিয়া, এতে নতুন সংযোজন ‘রোহিঙ্গা’ ইস্যু। এই প্রচার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে নিবিড় সংশোধনের পক্ষে শক্ত অজুহাত খাড়া করেছে।
এই অভিযোগগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মন গড়া। একে অ-প্রমাণ করাও যেমন অসম্ভব, প্রমাণ করা সঙ্গত কারণেই অসম্ভব, একই সঙ্গে এই প্রচার থেকে মুক্তি পাওয়াও অসম্ভব। কোন পরিসংখ্যানগত দাবি হিসেবে এটা উত্থাপিত হয় না, এটি এক মতাদর্শিক হাতিয়ার যা সংখ্যাগরিষ্ঠের ‘বিকৃত পূর্বধারণা’কে ভিত্তি করে বেঁচে থাকে। তেলেঙ্গানা বা কর্নাটকে, যেখানে ‘বাংলাদেশী’ ন্যারেটিভ কাজ করবে না, সেখানে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিকে বেশি করে উপরিতলে নিয়ে আসা হয়। কোনভাবেই ‘ডেমোগ্রাফিক’ বাস্তবতায় এর উপস্থিতি অসম্ভব। কিন্তু ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধিতে অমোঘ অস্ত্র। দিল্লির শাহীনবাগ এলাকায় ভোট জালিয়াতির অভিযোগ বহুদিন ধরে তোলা হচ্ছে, এবং নিবিড় সংশোধনের প্রশ্নটিকে যাথার্থ্য দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িক যুক্তিটি কিন্তু সব জায়গাতেই রয়েছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে সংশয়ের তালিকায় প্রথমে রেখে ব্যাপক বর্জন সম্ভাবনার আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে।
ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এইসব গল্প নতুন কিছু তো নয়। ‘হিন্দুত্ব-কল্পনার’ হৃদয়ে এই আখ্যান বসবাস করে। রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মুসলিম নাগরিকের অবস্থান সর্বদাই শর্তাধীন – তাদের আনুগত্য এবং আপোসের ক্ষমতার ওপর। এই সন্দেহ-সংশয়কে SIR আমলাতান্ত্রিক অভিযানের গভীরতর স্তরে নিয়ে যেতে পারে। এতে বহিষ্কারের প্রয়োজন পড়ে না, যাচাই যথেষ্ট আর এই যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নাগরিকত্বের ধারণা নিজেই অনিশ্চিত অবস্থানে চলে যায়।
নির্বাচন কমিশনের রূপান্তর
SIR এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে যার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। যার কৃতিত্বের মুকুটে প্রায়শই যুক্ত করা হয় বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র নির্বাচন পরিচালনার পালক। নির্বাচন কমিশন ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট মাত্রার স্ব-শাসন উপভোগ করেছে এবং জনসাধারণের বিশ্বাস অর্জন করে এসেছে। ৯০ এর দশকে, টি এন সেশনের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, ক্যারিশ্মা ও হস্তক্ষেপের উপর ভিত্তি করে, নির্বাচন কমিশন এক ধরনের নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো বদলে যায়। মোদী যুগে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার ক্রম-ক্ষয় ঘটেছে।
একদা নির্বাচন কমিশনের নিয়োগে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে এক নির্দিষ্ট মাত্রার মতৈক্যের প্রয়োজন হতো। এখন ক্রমশই সরকারি প্রশাসনের দিকে কমিশনের নমনীয়তা স্পষ্ট। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট, নির্বাচনী পর্বগুলির শিডিউল তৈরি, বিজেপি ও বিশেষত ক্ষমতায় থাকা তার মিত্র দলগুলির ক্রমাগত নির্বাচনী বিধিভঙ্গের ওপর কোন ব্যবস্থা না নেওয়া, ভিভিপ্যাটের অডিট ঘিরে অস্বচ্ছতা – বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্ক কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তুঙ্গে তুলে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই SIR এই উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ এই প্রক্রিয়ায় কমিশনের হাতে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত অবাধ ক্ষমতা এবং কোথায় কিভাবে সংশোধনী হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার নিরঙ্কুশ অধিকার। এই ক্ষমতার বৈশিষ্ট্যগুলি কেমন তার কোন স্বচ্ছ বিবরণী পাওয়া যায় না। এজন্যই এই অতিরিক্ত ক্ষমতা রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিবর্তিত হবার বিপুল সম্ভাবনা।
নাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষকরা পশ্চিমবঙ্গ, কর্নাটক এবং তেলেঙ্গানায় যে ধরনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করেছেন তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। তা স্বতন্ত্র যাচাইয়ের দাবি রাখে —শাসক দলের সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে ভেরিফিকেশন টিম তৈরি হওয়া এবং অনেক জায়গাতেই বিরোধীরা সদস্য দিতে অপারগ, সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলিতে অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ, অফিসিয়াল ডিলিশন লিস্ট এবং বিএলও অফিসারদের মৌখিক বিবৃতির মধ্যে পার্থক্য, যাচাই-বিধি নিয়ে বিভিন্ন কনস্টিটিউয়েন্সিতে ফারাক ইত্যাদি। নির্বাচন কমিশন এইসব নিয়মবিধি বহির্ভূত কাজের তদন্তের বদলে SIR এর ‘ত্রুটিশূন্যতা’র স্বপক্ষে সওয়াল করেছে। ত্রুটিশূন্যতার গর্জন প্রকৃতপক্ষে বর্জনকে বৈধতা দিচ্ছে।
সংকট আসলে কাঠামোগত। একটি প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত নির্বাচনের লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শাসনের আওতায় তার রূপান্তর ঘটছে। যে শাসক শুধু নির্বাচনী বিজয় নয়, আধিপত্য চায়। এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষতা কমিশনের পক্ষে একটা বোঝা। তা সে ঝেড়ে ফেলেছে। SIR কমিশনের ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু স্বাধীনতার প্রতীক। প্রতিষ্ঠানটিকে শাসকদল ব্যবহার করছে এমন কতগুলি উদ্দেশ্য সাধন করতে, যা তারা নিজেরা সরাসরি করতে পারবে না। নির্বাচকমণ্ডলীর এক “ডেমোগ্রাফিক” পুনর্গঠন চলছে যা বিজেপির পক্ষে যায়। এর ফল প্রতিষ্ঠানগুলির বিশ্বাসযোগ্যতার মৃত্যু। জনমানসে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার অপমৃত্যু ফ্যাসিবাদী শক্তি-সংহতির জন্য অত্যাবশকীয়।
ক্ষমতার অস্ত্র হিসাবে এন্যুমারেশনের বিবর্তন : একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া
বর্তমান SIRকে বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিকতাকেও বোঝা প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক সময়ের যুক্তিগুলি আগেই আলোচিত হয়েছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে স্বাধীন ভারতে সেই যুক্তিগুলোরই পুনরাবর্তন ঘটেছে। জাতীয় নির্বাচক তালিকার রক্ষক হিসাবে নির্বাচন কমিশনের আবির্ভাব হয়েছে। ভারতীয় আমলাতন্ত্রের ‘কাগজপত্রের’ ওপরে অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ, জীবনের প্রয়োজনে মানুষের স্থানান্তরের উপরে অবিশ্বাস, নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট করা আইডেন্টিটির উপরেই বৈধতা আরোপ, ঔপনিবেশিক ধারারই পুনরাবৃত্তি। বিজেপির আমলে যে পরিবর্তনটা হয়েছে তা আমলাতান্ত্রিকতার নয়, তার অভিমুখের। দীর্ঘলালিত এন্যুমারেশন পদ্ধতি যা আমলাতান্ত্রিক হয়রানি সত্ত্বেও আদর্শগতভাবে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে চালিত ছিল বর্তমান SIR তাকে বর্জনের দিকে চালিত করেছে, প্রতিনিধিত্বের বদলে ছাঁকনি হিসেবে।
উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে আসামে এনআরসি বর্জন প্রক্রিয়ার প্রথম উদাহরণ। ১৯৮০তে আসাম আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে ভাষিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল, বিজেপি তাকে সুচারুভাবে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদে পরিণত করে। এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজন হয় NRC-র। ২০১৯ সালে চূড়ান্ত তালিকা থেকে ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ পড়লেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যা অনেক হলেও প্রান্তিকায়িত হিন্দুর সংখ্যা অধিকতর। NRC পদ্ধতিতে আমলাতান্ত্রিক অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন রকম অত্যাচার-হয়রানি প্রমাণ করেছে ভারতের মতো দেশে, যেখানে অসংখ্য মানুষ পর্যাপ্ত পরিমাণে ডকুমেন্ট রাখবার মতো স্থিতিশীল অবস্থায় থাকেন না, সে দেশে নাগরিকত্বকে ‘কাগজপত্রে’র সঙ্গে বেঁধে রাখবার প্রবণতা কী ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যদিও NRC হওয়ার কথা ছিল শুধু আসামে, অতি দ্রুত বিজেপি তাকে জাতীয় স্তরে প্রয়োগ করার জন্য কাঠামোগত পদক্ষেপ নেয়। ২০১৯ এর CAA, নাগরিকত্বের জন্য, সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার বৈশিষ্ট্যকে পাশ কাটিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক ছাঁকনির ব্যবস্থা করে। জাতীয় স্তরে SIR প্রক্রিয়া চালু করবার সম্ভাবনা NRC-NPR ছাঁচের মধ্যেই নিহিত ছিল। SIRকে এই পরিপ্রেক্ষিতেই বুঝতে হবে। কোন বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতি নয়, NRCর মতো নাটকীয় না হলেও বা অতটা দৃশ্যমান না হলেও অতটাই বিপদজনক। রুটিন নির্বাচনী কার্যক্রমের মধ্যেই ভোটাধিকার বঞ্চনার হাতিয়ার হিসাবে এর জন্ম। অতি ধীরে NRCর উদ্দেশ্যসাধন করছে, বিনা সংসদীয় বিতর্কে, জনগণের অসহায়তায়, প্রায় বিনা গণ প্রতিবাদে, বিনা নতুন আইন প্রণয়নে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ফাঁকফোকর দিয়ে রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণের পালা চলছে।
সংবিধানকেন্দ্রিকতা ও তার সীমাবদ্ধতা
প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে SIR সংবিধানসম্মত কিনা। উদার ভাষ্যকারেরা একে আইনী পরিসরে সীমাবদ্ধ করতে চাইবেন। আর্টিকেল ১৪ এবং ১৫ ধর্ম, জাত, লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরোধিতা করে। আর্টিকেল ১৯ বাসস্থান এবং দেশের অভ্যন্তরে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। আর্টিকেল ৩২৬ প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার সুরক্ষিত করার নির্দেশ দেয়; জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন নির্বাচনী তালিকায় কোনপ্রকার বৈষম্যের কঠোর বিরোধিতা করে। সুতরাং কাগজে কলমে, বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ SIR, যাতে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু এবং বিরোধী-সমর্থক নির্বাচকমণ্ডলীর বৈষম্য ঘটবার আশংকা রয়েছে -তা সংবিধানের মূল প্রবণতাকে আঘাত করে নিঃসন্দেহে।
কিন্তু সংকটের শিকড় আরও গভীরে নিহিত। সংবিধানে স্থিত সমস্ত প্রগতিশীল ধারণাকে স্মরণে রেখেও একথা বলতেই হবে, যে তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই নিহিত আছে একধরনের আমলাতান্ত্রিকতার ঝোঁক, অন্য প্রগতিশীল ধারণাকে একপাশে সরিয়ে এই SIR ঠিক সেই ঝোঁকটিকে বেছে নিয়েছে। নাগরিকত্ব, চিহ্নিতকরণ এবং এন্যুমারেশনের প্রশ্নে যে ধরনের ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য সংবিধান বহন করে তাকে আজও সংকুচিত করে আনা যায়নি। বরং সেই সুযোগে উত্তরোত্তর জনগণের অধিকার সীমিত করার সংশোধন তার উপরে চাপিয়ে দেওয়া গেছে। সংবিধানে ‘মানুষের অধিকারের’ পরিকল্পনা অত্যন্ত অস্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে স্থাপিত হয়েছে প্রশাসনিক কাঠামোর উপর। অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু তার প্রয়োগ প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল এবং জন-নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে তা চূড়ান্ত থাকবন্দী ক্ষমতা দ্বারা চালিত।
তাছাড়া, ‘জনগণের অধিকার’ ঐতিহাসিকভাবে সম্পূর্ণ ভর করে আছে বিচারব্যবস্থার ব্যাখ্যার উপর – যা মন্থর, অসম এবং প্রায়শই রক্ষণশীল একটি প্রক্রিয়া। খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে আদালত সর্বদাই সংবিধান স্বীকৃত “ব্যক্তির অধিকার” খর্ব করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে, বিশেষত তাতে যদি জাতীয় সুরক্ষা বা জনবিন্যাস সংক্রান্ত বিষয় যুক্ত থাকে। এই কারণেই SIRকে আইনী চ্যালেঞ্জে পরাহত করা কঠিন। প্রতিটি বাতিলকরণকে প্রশাসনিক সংশোধন হিসেবে দেখানো হবে, অধিকার-লংঘনের প্রশ্ন গৌণ হয়ে যাবে। আসাম এর উদাহরণ। অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য দীর্ঘ আইনী লড়াইয়ের ফাঁকে “ভোট” নিজের নিয়মে আসা-যাওয়া করতে থাকবে।
সুতরাং SIR এইভাবেই সংবিধানের গণতান্ত্রিক উপাদানগুলিকে ঘুরপথে এবং সংবিধান-নির্দিষ্ট আমলাতান্ত্রিক মেশিনারির মধ্য দিয়েই হত্যা করতে থাকবে। সংবিধানের কাঠামোগত পক্ষপাতকে মাথায় রেখেই আইনী লড়াই কতটা অগ্রাধিকার পাবে তা ঠিক করতে হবে। ফ্যাসিবাদী শাসকের অধীনে এই “পক্ষপাত’’ কোন পর্যায়ে যেতে পারে তা আসামের NRC এবং বর্তমান SIR দেখিয়ে দিল।
নাগরিকত্ব, অংশভুক্তি এবং হিন্দুত্বের যুক্তিক্রম
মূলগতভাবে SIR একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে প্ররোচিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নাগরিকত্বকে যা পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে চায়। সংঘ-পরিবারের নাগরিকত্বের ধারণা ‘সিভিক’ নয়, সাংস্কৃতিক। সেই মতাদর্শ ভারতবর্ষকে এমন একটি সভ্যতাগত জন-সম্প্রদায়ের বাসভূমি হিসাবে দেখে যেখানে সংখ্যাগুরু হিন্দু স্বাভাবিক প্রজা (এখানে উচ্চবর্ণ ধরে নেওয়াই সঙ্গত, বিজেপি শাসিত ভারতে হিন্দু দলিতের অবস্থান কারোর অজানা নয়) এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অংশগ্রহণকারী হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে। সেই জন্যেই বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তাদের বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যকে যাচাই করে নেওয়া হবে। বোঝাই যায় যে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি এখানে সর্বজনপ্রযোজ্য না হয়ে শর্তাধীন হয়ে পড়ে। SIR, অন্যান্য মতাদর্শিক হাতিয়ারের মতোই, সংঘ-পরিবার বা বিজেপির আরেক হাতিয়ার। ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রকল্প’কে যা প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি মান্যতা দেবে। সুতরাং এই ‘ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ প্রকল্পের যাচাই পরীক্ষায় মুসলিম ভোটার, আন্তঃরাজ্য শ্রমিক, দলিত ভাড়াটিয়া, উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসী পরিবার এবং প্রান্তিকায়িত লিঙ্গ যৌনতার মানুষ ও মহিলা (শেষ দুটি ক্ষেত্র যেকোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রবাদী অবদমনের স্বাভাবিক শিকার) ক্রমাগত রাজনৈতিক উদ্বেগের মুখে পড়বেন। প্রত্যেকটি বাতিলকরণ সংঘের মতাদর্শিক সংহতিকে জোরদার করবে। এই কারণেই সংঘের রাজনৈতিক কল্পনায় ‘বাংলাদেশী’ একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। তিনভাবে এটি তার উদ্দেশ্যপূরণ করছে। এক, ‘জাতিগত নাগরিকত্বে’র মাধ্যমে মুসলিম পরিচিতিকেই ‘বৈদেশিকতা’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ এ পরিণত করছে। দুই, সীমান্ত রাজ্যগুলিতে ‘ডেমোগ্রাফিক পুলিশী’কে মান্যতা দিচ্ছে এবং তিন, ‘সন্দেহের শব্দাবলী’র (রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি, ঘুষপেটিয়া) স্বাভাবিকীকরণ ঘটাচ্ছে এবং যেকোনো পরিসরে তাকে প্রয়োগ করার আইনি বৈধতা তৈরি করছে। প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারকে যদি গভীরভাবে ‘প্রশাসনিক সম্মতি’র (administrative approval) উপরে নির্ভরশীল তোলা যায় তাহলে নির্বাচকমণ্ডলী ধীরে ধীরে ‘স্বগঠিত স্বত্ত্বা’(self constitute body) হিসেবে তার নিজস্বতা হারাবে। ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ক্ষমতার একটি প্রত্নবস্তুতে পরিণত হবে। নির্বাচন আসবে যাবে কিন্তু জনগণের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্বেচ্ছাধীনতা হারিয়ে ‘সজ্জিত-সম্মতি’তে (curated self-determination) পরিণত হবে। দীর্ঘকালীন এই বিবর্তন প্রক্রিয়ায়, SIR গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে রূপান্তরিত করার মোক্ষম হাতিয়ার।
ভোটাধিকার বঞ্চনা এবং অদৃশ্য শ্রম
‘ভোটাধিকার বঞ্চনার’ এই বিরাট কর্মযজ্ঞ দাঁড়িয়ে রয়েছে বিপুল অদৃশ্য শ্রমের উপর। সারা ভারত জুড়ে হাজার হাজার বুথ লেভেল অফিসার, অস্থায়ী কর্মী, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এবং স্থানীয় প্রশাসনকে (যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল, অথচ একই সঙ্গে এই কারণে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রসরকারী পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে, সবচেয়ে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন) নিযুক্ত করা হয়েছে অত্যন্ত অল্প সময়ে বিরাট পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়েই তুলনারহিত চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, প্রতিমুহূর্তে তারা উপর থেকে আসা হুমকিতে পর্যুদস্ত হচ্ছেন। নানা রাজ্যে অনেক বিএলও প্রশাসনিক শাস্তির ভয়ে এবং কাজের চাপে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।
পাশাপাশি একটা অন্য রাজনীতিও রয়েছে। বিপুল পরিমাণ কাজ অত্যন্ত অল্প সময়ে করতে গেলে কর্মীদের ভুল ভ্রান্তির সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার জন্য গণক্রোধ কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে ধাবিত না হয়ে প্রতিনিধি স্বরূপ এই কর্মীদের দিকে ধাবিত হতে পারে বা হচ্ছেও।
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই তালিকা প্রস্তুতকরণে যারা শ্রম দিচ্ছেন তাঁদের স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ও জটিলতার সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলতে হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ বা তেলেঙ্গানার মত রাজ্যগুলি, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র, সেখানে বিজেপি সমর্থক বা বিজেপি বিরোধী দলীয় সদস্যরা এই সমস্ত কর্মীদের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। কাজেই প্রশাসনিক শ্রম আর রাজনৈতিক শ্রমের খুব পার্থক্য থাকছে না। আদ্যন্ত আমলাতান্ত্রিকতার বাইরে স্থানীয় স্তরের মাইক্রো-রাজনীতিতেও SIR অনিবার্য প্রভাব রচনা করছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ছোট ছোট দালাল গোষ্ঠী তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়, যেমনটা আসামে দেখা গেছে, যারা নানাভাবে অসহায় জনসাধারণকে টাকা পয়সা বা অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে তালিকায় নাম তুলে দেবার প্রতারণা করতে পারে।
নির্ধারিত গণতন্ত্র:বিভেদ ও সন্ত্রাস
SIR এর রাজনৈতিক যুক্তিক্রম সব থেকে ভালো বোঝা যাবে বিজেপির নির্বাচনী মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলি বিশ্লেষণ করলে। এই মডেল ফুলে-ফলে কার্যকর হয়েছে সেইসব অঞ্চলে যেখানে হিন্দু সাম্প্রদায়িক ভোট সংহত করা গেছে, জাত ভিত্তিক পাটিগণিত মিলিয়ে দেওয়া গেছে আর জাতীয় গর্বের আখ্যানে বড় অংশের ভোটকে উদ্দীপ্ত করা গেছে। কিন্তু যেসব অঞ্চলে মুসলিম ভোট জোটবদ্ধ, ভাষা এবং আঞ্চলিক পরিচিতি সাংস্কৃতিক সমসত্ত্বীকরণকে পুরোপুরি সফল হতে দিচ্ছে না বা যেখানে নাগরিক মিশ্র সংস্কৃতি সংঘের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আনুগত্য-কর্ষণকে অতটা আকর্ষণ করেনি, সেখানে এই মডেল কার্যকর হয়নি। সামাজিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে প্রশাসনিক এবং পদ্ধতিমাফিক করে তোলা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বর্তমান সময়টা পূর্বেকার কর্তৃত্ববাদী পর্বগুলির চেয়ে আলাদা, তীব্রতার দিক থেকে নয়, কাঠামোগত দিক থেকে। ১৯৭৫ এর জরুরি অবস্থার মত মৌলিক অধিকার সরাসরি খর্ব করা হয়নি, দৃশ্যমান নাটকীয়তা না দেখিয়েও গণতন্ত্র ও নির্বাচনের অধিকারকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক গবেষকরা একে বলেন “নির্বাচনী কর্ত্তৃত্ববাদ’’ বা “নির্ধারিত গণতন্ত্র’’। নির্বাচন বাতিল না করেও তার ক্ষেত্রগুলিকে যদি সংকুচিত করে আনা যায় তাতে দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ায় সংঘের হিন্দু রাষ্ট্র প্রকল্প রূপ পাবে। এই ধরনের ধৈর্য সংঘ ১০০ বছর ধরে দেখাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় এখন থেকে বারবার জনসাধারণকে দলিল, হিয়ারিং ইত্যাদি নিয়ে, নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যস্ত থাকতে হবে। এতে যে ভীতি এবং সন্ত্রাসের আবহাওয়া তৈরি করা গেছে, তার ফলস্বরূপ ২০১৯এর NRC বিরোধী আন্দোলনের মতো জমাট বাধা গণআন্দোলন তৈরি হতে পারেনি। কোন দৃশ্যমান দমন পীড়ন ছাড়াই এই অবস্থা তৈরি করা গেছে। পাশাপাশি SIR অনিবার্য এক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া — এই ধারণার স্বপক্ষে জনসম্মতি তৈরি করা গেছে।
বিরোধী শক্তির ভূমিকা:দ্বিধা ও ভোটের হিসেব-নিকেশ
বিরোধী পক্ষের অসম এবং প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্থ বিরোধিতা প্রমাণ করছে বিপদ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবের চেয়েও গভীর কোন রাজনৈতিক কৌশলের অনুপস্থিতি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধী শক্তিসমূহ SIRকে জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ভূমিকার পক্ষে বিপদজনক বলে চিহ্নিত করলেও সম্মিলিতভাবে কোন সংহত জাতীয় মাত্রার প্রতি-যুক্তি তৈরি করে উঠতে পারেনি। বিজেপির আইনগত ও প্রশাসনিক এই আগ্রাসন রুখে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের প্রতিক্রিয়াগুলি বিচ্ছিন্ন– স্থানীয় স্তরের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, নির্বাচনী পাটিগণিতের উত্তর মেলানোর প্রয়াস এবং সর্বোপরি ‘অযোগ্য ও অবৈধ ভোটারকে’ সুরক্ষা দেওয়ার ভাবমূর্তি জনমানসে তৈরী হচ্ছে কিনা – এইসব বিষয়ের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস প্রাথমিকভাবে SIRএর তীব্র সমালোচনা করলেও বা একে কেন্দ্র রাজ্যের সম্পর্কে অন্তর্ঘাত এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে ব্যাখ্যা করলেও কার্যক্ষেত্রে এর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যাপক গণসমাবেশ ঘটাতে দেখা যায়নি যা সে চেষ্টা করলেই পারতো। পরিবর্তে সে জনসাধারণকে সতর্ক হতে বলেছে, নিখুঁতভাবে তালিকা পরীক্ষা করে নিতে বলেছে এবং প্রয়োজনে অভিযোগ দাখিল করার পরামর্শ দিয়েছে। সিপিআইএম প্রথম থেকেই SIRকে একটি সাংবিধানিক অনিবার্য প্রক্রিয়া হিসাবে বিচার করে জন সহায়তা শিবির খুলে এন্যুমারেশন ফর্ম ফিলাপে সহযোগিতা করেছে। এরা কেউই বিজেপির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কোন কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা ভাবেনি বা ভাবছে না।
তামিলনাড়ুতে প্রতিক্রিয়া অনেক তীব্র, কিন্তু সীমাবদ্ধ। ডিএমকে SIRকে সরাসরি ‘পিছন দরজা দিয়ে NRC এবং বেনাগরিক করার কৌশল’ বলে ব্যাখ্যা করেছে এবং সুপ্রিমকোর্টে এর বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। কিন্তু মামলার ভিত্তি ‘কেন্দ্রীয় যাচাই ব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে ‘ফেডারেল অটোনমি’। এই বিরুদ্ধতার দীর্ঘ ইতিহাস তাদের রয়েছে। পদ্ধতিগত কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কে কেন্দ্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল ভিত্তি তামিল জাতীয়তাবাদ এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নটিই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। SIR এর বিরুদ্ধে সংহতিমূলক জাতীয় যুক্তি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এতে নেই যা আন্তঃরাজ্য শ্রমিক, সংখ্যালঘু এবং শহরের দরিদ্র শ্রেণীকে সারা ভারত জুড়ে তালিকা-সুরক্ষার আওতায় আনতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াই সমকালীন দ্রাবিড় রাজনীতির প্রকৃত সংকটের মুখ উন্মোচন করে। SIR-এর বিরুদ্ধে ডিএমকের অবস্থান সুদৃঢ় হলেও তা রাজনৈতিকভাবে সংকুচিত। ভোটাধিকারকে একটি সর্বজনীন গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে রক্ষা করার বদলে প্রশ্নটি আটকে থাকে কেন্দ্র–রাজ্য ক্ষমতার দরকষাকষিতে। ফলে SIR যে একটি সর্বভারতীয় ভোটার-বাছাই প্রকল্প—যার প্রধান শিকার আন্তঃরাজ্য শ্রমিক, সংখ্যালঘু এবং শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী—এই মৌলিক রাজনৈতিক সত্যটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট থাকে। তামিল জাতীয়তাবাদ এখানে প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, তা আর সামাজিক-গণতান্ত্রিক সম্প্রসারণের হাতিয়ার নয়; বরং তা ক্রমশ প্রশাসনিক ফেডারেলিজমের নিরাপদ গণ্ডিতে সরে গিয়ে ভোটাধিকার সংকোচনের বৃহত্তর কর্তৃত্ববাদী প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলছে।
কেরালা অন্য একটি মডেল অনুসরণ করেছে। কংগ্রেস সমর্থিত সিপিআইএম সরকার SIR এর উদ্দেশ্য ও পরিণতিকে প্রশ্ন করে একটি বিধানসভা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। তবে তা রাজ্যে SIR প্রয়োগের বিরোধিতা মাত্র। বিজেপির বৃহত্তর নির্বাচনী বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে জাতীয় মাত্রার আন্দোলন গড়ে তোলার কোন ইঙ্গিত এতে নেই। অবস্থানটি আদর্শগত, কিন্তু সীমাবদ্ধ।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ইতিমধ্যে এই বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার চরম পর্যায়ে উপনীত। জাতীয় স্তরে SIRকে ‘নিয়ম বহির্ভূত এবং বর্জনমূলক’ বলে চিহ্নিত করলেও রাজ্যস্তরে বিভিন্ন অঞ্চলে কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ার ফারাক যথেষ্ট, জোটসঙ্গীদের মতামত এবং নির্বাচনী দুর্বলতার সাপেক্ষে বিরোধিতার বয়ান নির্মিত হয়েছে। SIR প্রশ্নে বিজেপির ধারাবাহিক বিরোধিতা ও আন্দোলন কংগ্রেস করেনি কারণ জনমানসে ‘অবৈধ ভোটারদের’ পক্ষে কথা বলার ভাবমূর্তি তৈরি হওয়ার ভয়।কংগ্রেসের অস্বচ্ছ ভূমিকা গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে নিজের অন্দরমহলেই– গণতান্ত্রিক পদ্ধতি রক্ষা করা আর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিরতে আঘাত, এই দুয়ের মধ্যে কংগ্রেসের দোলাচল ধারাবাহিকভাবে চলছে। ছোট ছোট পার্টিগুলিও বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ওই একই উদ্বেগে ভুগেছে। আম আদমি পার্টি SIR এর সমালোচনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার গলদকেই প্রাধান্য দিয়েছে। মিম খুব খোলাখুলি SIRকে ‘সংখ্যালঘুর ভোটাধিকার বঞ্চনা’ বলে ব্যাখ্যা করলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য খুব বেশি নয়। ইন্ডিয়া জোটে একমাত্র সিপিআইএমএল(লিবারেশন) স্পষ্টভাবে SIR এর বিরোধিতা করেছে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতির মাত্রায় তার গুরুত্ব এখনো দৃশ্যমান নয়। বিরোধী শক্তির দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিক্রিয়া থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার – রাজনৈতিক দলগুলি SIRকে একটি পদ্ধতিগত গণতন্ত্র-বিচ্যুতি হিসেবে না দেখে রাজ্যভিত্তিক অনিয়ম কেন্দ্রিক বিরুদ্ধতার বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধে আগ্রহী। ফলে এই প্রতিরোধ বিজেপির বৃহত্তর এজেন্ডাকে বিন্দুমাত্র চ্যালেঞ্জ জানাতে পারছে না। এই প্রশ্নটি কারোর কাছেই গুরুত্ব পায়নি যে SIR নাগরিকত্বকে শর্তাধীন করে তুলছে। নিজেদের ভোটার-ভিত্তিকে রক্ষা করে যতটুকু SIR বিরোধিতা করা যায় বিরোধী দলগুলি তাই করছে। SIRকে বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ জানাতে গেলে যে রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন তা কোন বিরোধী দলই নিতে রাজি নয়। একথা ভুললে চলবে না প্রতিটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকলে ‘’ভুয়ো ভোটার’ এবং অনেকেই ‘অনুপ্রবেশ’কে ভোটের ইস্যু বানায়, এবং তদনুযায়ী সহচর মিডিয়া আখ্যান নির্মাণ করে থাকে। আজ অবশ্য মিডিয়া ইন্ড্রাস্টিটাই বিজেপি ও সংঘ পরিবারের আওতায় চলে গেছে।
নাগরিক সমাজ ও প্রতিরোধ-আন্দোলন
নির্দিষ্ট দু-একটি সিভিল সোসাইটি গ্রুপ ছাড়া SIR পদ্ধতি বাতিল করার দাবির পক্ষে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা তেমন দেখা যায়নি। অনেক সংগঠন বাতিল-কৃত নাম নথিবদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে অথবা ধারাবাহিকভাবে তালিকায় নাম উদ্ধারে জনগণকে সহায়তা করে চলেছে। নিঃসন্দেহে এই কাজগুলি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যক। কিন্তু একই সঙ্গে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ছোট ভলেন্টিয়ার নেটওয়ার্ক, ক্ষুদ্র বাজেট এবং নির্বাচনী তথ্যে সীমাবদ্ধ অধিগম্যতা কাজটিকে তাদের কাছে অনেক কঠিন করে তুলেছে। তাছাড়া SIR এর নিয়ম ও কার্যবিধির অস্বচ্ছতা এই ধরনের হস্তক্ষেপের পক্ষে যথেষ্ট অসুবিধাজনক। তবুও সিভিল সোসাইটি গ্রুপগুলো মানুষের অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। বিরুদ্ধতার বিকল্প আখ্যান নির্মাণে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই সংগ্রাম শুধু কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধনের সংগ্রাম নয় — এই প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক নয় বরং বর্জনকামী এবং এই বর্জনকামিতার উদ্দেশ্য পরিপূরণ করার জন্য নানা অঞ্চলে নানা ধরনের বিভেদ তৈরি করতেও বিজেপি পিছপা নয়– এই বিষয়গুলিকে তুলে ধরার কাজ এবং সেই সঙ্গে ভোটাধিকার বঞ্চিতদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা ও জনসমক্ষে নিয়ে আসাও তাদের কাজ হতে পারে। এর জন্য প্রতিক্রিয়া-মূলক আইনবাদ থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক সমাবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। SIR এবং বিজেপির বৃহত্তর উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামাজিক কর্মসূচি নেওয়া আশু প্রয়োজন।সব থেকে বড় প্রয়োজন প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। অন্তত এই কাজের মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্র যে মানুষের, সরকার বা সংসদীয় রাজনৈতিক দলের দ্বারা নির্ধারিত কোন ব্যবস্থা নয়, সেই বোধের প্রচার হোক।
SIR এর ভূগোল
SIR এর ভৌগোলিক অঞ্চলগুলিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তেলেঙ্গানা দিয়ে যদি শুরু করা যায় দেখা যাবে ২০২৩ এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি আংশিক সাফল্য লাভ করতে পেরেছে। হায়দ্রাবাদের পুরনো শহর এবং পরিযান শ্রম সমৃদ্ধ সাইবারাবাদ অঞ্চল SIR এর মূল ফোকাস। কর্নাটকে ২০২৩ এ বিজেপির পরাজয়ের পর বেঙ্গালুরুর ভাড়াটিয়া অধ্যুষিত নির্বাচন ক্ষেত্রগুলি SIR এর বাতিলকরণের কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। যে অঞ্চলগুলি সাম্প্রতিক নগর নির্বাচনগুলিতে বিজেপির বিরুদ্ধে জোরালো মতদান করেছে। তামিলনাড়ু বা কেরালা যেখানে ‘হিন্দুত্ব’ নির্বাচনী ক্ষেত্রে প্রান্তিক হলেও জনবিন্যাসে এবং সামাজিক সংস্কৃতিতে ধীর প্রবেশ ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিক কেরালায় ‘বাংলাদেশী’’ দাগিয়ে নির্মমভাবে একজন আন্তঃরাজ্য শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। কেরালার মতো তথাকথিত বামমনস্ক সমাজে এই ঘটনা বিস্ময় ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। এখানকার মুসলমান এবং ক্রিশ্চান জনসংখ্যাকে কোনঠাসা করার জন্য বিভিন্ন যাচাই না করা অভিযোগের ভিত্তিতে, মতাদর্শিক অনুমোদন অনুযায়ী প্রশাসনকে নিজেদের পক্ষে নমনীয় করে নেওয়া হচ্ছে।
দিল্লির কথা তো বলাই বাহুল্য। ধারাবাহিকভাবে শ্রমিকবস্তি ভাঙ্গা হয়েছে, বাংলাদেশী দাগিয়ে বাঙালি শ্রমিককে বাংলাদেশে সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে । অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবি এবং তার সাথীদের সাথে হওয়া নিষ্ঠুরতার কথা সকলেই জানেন, এঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। ভোটাধিকার বঞ্চনার প্রশ্নটি আলাদা করে আলোচনার দাবিই রাখে না। কারণ মেহেরোলি, খাজুরি খাস, জাহাঙ্গীরপুরী ইত্যাদি এলাকায় উচ্ছেদের মাধ্যমেই ভোটাধিকার বঞ্চনার কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। মনিপুর বা নাগাল্যান্ডে এমনিতেই ‘এথনিক সার্ভেলেন্স’ এর নামে চূড়ান্ত মিলিটারি সমাবেশ ও নজরদারি চলে, আন্তঃগোষ্ঠী লড়াইগুলোকে জিইয়ে রাখা হয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য। একেই আরো গভীরতর করেছে SIR এর যুক্তিক্রম। সারাভারতে দুয়েকটি তথাকথিত ‘নিউট্রাল’ অঞ্চল রেখে, বাদবাকি রাজ্যগুলো বেছে নেওয়ার ধরন দেখলে SIRকে কখনোই রুটিন কার্যক্রম মনে হয় না। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্পের উদ্দেশ্য-সাধনের জন্য প্রশাসনকে ব্যবহার করে জনসংখ্যার রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ভূমিকা কে যাচাই করাই এর লক্ষ্য।
পশ্চিমবঙ্গঃ বিরোধিতার শেষ সীমান্ত
SIR এর রাজনৈতিক নকশায় পশ্চিমবঙ্গের অবস্থানটি বেশ অদ্ভুত। গত এক দশক ধরে জনবিন্যাস সম্পর্কিত ‘অশনি সংকেত’’ এর রাজনৈতিক নাটক উপস্থাপন করা বিজেপির বেশ পছন্দের কার্যক্রম থেকেছে। এ রাজ্যটিকে তারা ‘বাংলাদেশী’ বকলমে মুসলিম পরিচালিত রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গ একটা সীমান্ত-রাজ্য যার সীমান্ত ভালো রকম সচ্ছিদ্র, দুর্নীতিপূর্ণ এবং সে জন্য নির্বাচনগত দিক থেকে এর প্রশাসন অবৈধ – এমনটা বিজেপির দাবি। SIR এর খসড়া তালিকা এই আখ্যানকে যথেষ্ট জটিল করে তুলেছে। বিজেপির প্রত্যাশিত ন্যারেটিভ এখানে মেলেনি। স্থানীয় বিজেপি নেতারা ক্রমাগত হিংস্রভাবে প্রচার করে এসেছেন বিরাট পরিমাণ ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ এবং রোহিঙ্গা ( ধরে নিতে হবে মুসলমান এবং রোহিঙ্গা / বাংলাদেশী সমার্থক, বিজেপি বয়ান অনুসারে) জনসংখ্যা এই তালিকা থেকে বাদ পড়বেন। কিন্তু গড় হিসেবে দেখা যাচ্ছে মুসলিম প্রধান জেলাগুলি মোটেই উল্লেখযোগ্য ভাবে বাতিলকরণের মুখোমুখি হয়নি সারা রাজ্যের নিরিখে। অন্তত খসড়া তালিকা এখনো অব্দি সাম্প্রদায়িক ভোটাধিকার বঞ্চনার কৌশল গুলি প্রদর্শন করছে না। সেদিক থেকে কোটি কোটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গার গল্প একেবারেই দাঁড়ায়নি। তবে কোটি ঊর্ধ্ব মানুষ হিয়ারিং এর জন্য ডাক পেয়েছেন। যেহেতু তার কোন সম্প্রদায় ভিত্তিক ডেটা এইমূহুর্তে নেই, তাই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না হওয়া অবধি অপেক্ষা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
তবে পশ্চিমবঙ্গে SIR এর যে বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা গেল, নিঃসন্দেহে গণহারে ভোটার বাতিলের প্রক্রিয়াকে সে স্বাভাবিক করে তুলেছে এবং ভবিষ্যতেও তুলবে। খসড়া তালিকায় মোটামুটি ভাবে ৫৮ লাখ নাম বাদ পড়েছে। পাশাপাশি এক কোটি সাত লক্ষ মানুষ নানা ধরনের অনিয়ম এবং অভিযোগের ভিত্তিতে গণশুনানিতে ডাক পেয়েছেন। গণশুনানিতে ডাক পাওয়ার মাত্রা অভূতপূর্ব। এখন লক্ষ লক্ষ ভোটারের কাঁধে দায় বর্তাল, কাগজপত্র দেখিয়ে, আমলাতন্ত্রের বিস্তর বাধা পার করে, নিজেদের ভোটার প্রমাণ করার। অর্থাৎ শর্তাধীন নাগরিকত্বকে SIR স্বাভাবিক করে তুললো। বিহার এবং আসামের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে মুসলমান নাম হয়তো কম বাদ পড়েছে, কিন্তু বাদ পড়ার বিষয়টিকে পদ্ধতিগত করে তোলার বিপদজনক প্রবণতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। যাচাই, ডিটেনশন ক্যাম্পের ত্রাস এবং আইনি জটিলতার মাত্রাবৃদ্ধি ভোটারদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া গেছে, খসড়া তালিকায় নাম ওঠার পরেও তারা বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে গণ শুনানিতে ডাক পেয়েছেন এবং সেখানে তাদের নিজেদেরকে ভোটার হিসাবে প্রমাণ করতে হবে। পশ্চিমবাংলার বিরাট সংখ্যক মতুয়া জনসংখ্যা এই শর্তাধীন নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ার শিকার হলেন। তাদের উদ্বাস্তু ইতিহাস, দলিল-কাগজের অপ্রতুলতা, বারবার ঠিকানা পরিবর্তন করতে বাধ্য হওয়া এক অনিশ্চিত এর মুখে তাঁদের ঠেলে দিল। অথচ SIR শুরু হওয়ার আগে CAA ক্যাম্প খুলে আবেদন করানো থেকে শুরু করে পয়সার বিনিময়ে সার্টিফিকেট দেওয়া ইত্যাদি বুজরুকিতে তাদের বিভিন্নভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিল বিজেপির পক্ষ থেকে। মতুয়াদের দীর্ঘকাল ধরে পরিচিতি ও নাগরিকত্বের জন্য প্রতীক্ষা এবং উদ্বেগকে বিজেপি ভোটের বাক্সে ব্যবহার করেছে কিন্তু SIR এর খসড়া তালিকা প্রমাণ করলো যে তাঁদের রাজনৈতিক উদ্বেগ বা নাগরিকতা সংক্রান্ত প্রত্যাশা বিজেপি পূরণ করবে না। দলিত উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে বিজেপি ‘অনিশ্চিতির’ কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি চালিয়ে যাবে।
মতাদর্শযোগে আমলাতন্ত্র কীভাবে কাজ করতে পারে তার গবেষণাগার হিসাবে অন্য যে কোন রাজ্যের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গ কয়েক কদম এগিয়ে আছে। বিজেপির আখ্যান অনুযায়ী যে ‘কোটি কোটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশী’ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে তার সাপেক্ষে এখনো অবধি কোন জনগণনাই তথ্য প্রমান হাজির করেনি, তা সত্ত্বেও এই মিথ জনমানসে একটা স্থায়িত্ব লাভ করেছে। এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সংসদীয় দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করে এসেছে। এই মিথ প্রতিটি মুসলমানকে সন্দেহের চোখে দেখার বৈধতা উৎপাদন করে এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক করুণার মুখাপেক্ষী করে তোলে। একথাও স্বীকার করতে হবে বিজেপি ছাড়াও পূর্বে অন্যান্য রাজনৈতিক দলও প্রয়োজন অনুযায়ী এই মিথ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ক্ষমতাসীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক সময় বিরোধী নেত্রী হিসাবে এই একই অভিযোগ করেছিলেন। আনন্দবাজার পত্রিকার মতো মিডিয়াগুলি অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে দীর্ঘকালীন ধারাবাহিক ন্যক্কারজনক মিথ্যা প্রচার চালিয়ে আসছে। SIR চলাকালীন বর্তমান সময়েতেও ভুয়ো ভিডিও তৈরি করে অনুপ্রবেশের গালগল্পকে রোমহষর্ক উপায়ে উপস্থাপন করে অনলাইন রোজগার বাড়িয়েছে ও বিজেপির হাত শক্ত করেছে।এই মিথ SIR এর পক্ষে এমনভাবে জনসম্মতি নির্মাণ করে যে মানুষ আসামে NRCর সাম্প্রতিক অতীতও ভুলে যায় এবং নিজের অধিকার হারানোর সম্ভাবনাকেও। খসড়া তালিকার ফলাফলও এই মিথকে হিন্দু-জনমানস থেকে হঠাতে তো পারেইনি বরং এই ধারণাকে সুনিশ্চিত করেছে যে মুসলমানদের নাম বাদ পরেনি কারণ তাঁরা তৃণমূলের রক্ষাকবচের আওতায় আছেন।
ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের বৃহৎ প্রেক্ষাপট
SIR যদি গণতন্ত্রকে ভিতর থেকে দুর্বল করার পদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে তার প্রতিরোধ-আন্দোলন অবশ্যই আইনি অথবা পদ্ধতিগত আবেদন নিবেদনের রাস্তা হতে পারে না। ভোটের তালিকায় নাম ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই বা ভোটাধিকার রক্ষার জন্য প্রচার আন্দোলন কিংবা সংবিধান বাঁচানোর জন্য রাজনৈতিক যাত্রা কখনোই এই লড়াইয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। একজন মানুষের বাসভূমি এবং তার সাথে তাঁর সংলগ্নতার প্রশ্নটি গভীরভাবে রাজনৈতিক। ভোটাধিকার সেই রাজনৈতিকতার একটি অংশ মাত্র। গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন শুধুমাত্র ‘ভোট প্রথা’ বাঁচানোতে সীমাবদ্ধ নয়, একটি সামগ্রিক ও সংঘবদ্ধ দাবি – কোন মানুষ অবৈধ নয়, কাউকেই তার রাজনৈতিক জীবন থেকে ‘সংশোধনের’ নামে বাইরে ফেলে দেওয়া যায় না। প্রতিরোধের বহুবিধ রাস্তার মধ্যে প্রথমেই যে দাবি আসে তা হল ‘নথিবদ্ধতা’ (enumeration) একমাত্র অন্তর্ভুক্তির কারণেই প্রয়োগ করার দাবি। এরজন্য শুধু প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি নয়, সক্রিয় গণ-নজরদারি এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রচার লাগাতার চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
দুই, জনবিন্যাস সম্পর্কিত মিথ্যা আখ্যানগুলির বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক ন্যারেটিভ নির্মাণ করা। তবেই SIR প্রক্রিয়ার অবৈধতা এবং ‘সন্দেহের’ মতাদর্শের ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করা সম্ভব।
তিন, ভোটাধিকার বঞ্চিতদের মধ্যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, এবং তা তুলনায় সহজ। কারণ তাঁদের অভিযোগ ও ক্রোধের কোন সাম্প্রদায়িক ভিত্তি নেই, তার রূপ কাঠামোগত। আবাসন-অনিশ্চয়তা, শ্রমের জন্য আন্তঃরাজ্য চলাচলের ক্ষেত্রে অ-সুরক্ষা, আমলাতান্ত্রিক হয়রানির ঝুঁকি। ভিনরাজ্যে বসবাসকারী শিক্ষার্থী, আন্তঃরাজ্য শ্রমিক, সংখ্যালঘু, মহিলা এবং প্রান্তিকায়িত লিঙ্গ-যৌনতার মানুষের জোট গোটা হতাশার ছবিকে সংগঠিত বিরুদ্ধতায় বদলে দিতে পারে, সেইসাথে SIR এর নিরিখে এবং আলোকে সংবিধান ও তার সীমাবদ্ধতার দিকগুলোকেও বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে সংবিধানকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করার কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে আমাদের একথা ভুলে গেলে চলবে না যে সংবিধান অসংখ্য কতৃত্ববাদী সম্ভাবনা বহন করে। কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রক্ষমতা, ব্যর্থ ফেডারেল কাঠামোর প্রতিশ্রুতি, ঔপনিবেশিক আইনের ঐতিহ্য এবং ক্ষমতায়িত আমলাতন্ত্র তার সূচক। এই স্ব-বিরোধ ততক্ষণ অবধি চাপা থাকে, যতক্ষণ রাজনৈতিক অভিজাতরা মোটামুটিভাবে একটা ‘গণতান্ত্রিক রীতি-প্রথা’ মেনে চলেন। ’হিন্দুত্বে’র আমলে এই স্ব-বিরোধ বিস্ফোরণের রূপ নিয়েছে। তাই শুধু সংবিধান ‘বাঁচালে’ই চলবে না, আরও গণতান্ত্রিকীকরণের দাবিগুলোও তুলতে হবে -SIR বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যা প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত।
তারও আগে প্রয়োজন বিজেপি বা সংঘপরিবারের রাজনীতির মূল কৌশল ‘বিভাজনে’র সাথে SIR কোন কোন মাত্রায় জড়িত তাকে সম্যকভাবে অনুধাবন করা।
বিভাজনের রণনীতি অথবা জননীতি
SIR এবং বৃহত্তর হিন্দি-হিন্দু- হিন্দুস্তান প্রকল্প শুধুমাত্র যে গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে তাই নয়, অতি-সক্রিয়তার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রগুলিকে বিশেষত সাংস্কৃতিক স্তরে নিজের কৌশল অনুযায়ী পুনর্গঠিত করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এবং এই কাজে তাদের হাতিয়ার, তাদের মূল রাজনৈতিক কৌশল– অনু-অনু বিভাজন। সাংস্কৃতিক বিভেদ সৃষ্টির এই রাজনীতির সবচেয়ে বিপদজনক দিক তা তৎক্ষণাৎ ‘বর্জন’ এর নীতি ব্যবহার করে না। তার চেষ্টা থাকে ধীরে ধীরে জন-ক্ষোভকে ভাষা, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিকতার মাত্রায় বিভক্ত করে ফেলার, যাতে তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে ফ্যাসিবাদের হাত শক্ত করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে যে প্রবল সাংস্কৃতিক উদ্বেগের জন্ম হয়েছে তার প্রত্যক্ষতা নিহিত রয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে বাঙলাভাষী শ্রমিকের উপর নিপীড়ন, অত্যাচার, হত্যা, বাংলাদেশি দাগিয়ে ‘পুশ ব্যাক’। কিন্তু হিন্দির ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বিজেপিরও পূর্বের ঐতিহাসিক সত্য। পূর্ব ভারতে যার সাথে অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাসও জড়িত আছে। এই ভাষিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দক্ষিণের ভাষিক-আঞ্চলিক লড়াইও অনেক পুরোনো। এখন বিজেপি হিন্দির ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আক্রমণকে তীব্রভাবে ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক ও শারীরিক হিংসার উগ্রতার দিকে নিয়ে গেছে। বাঙালি এই বিবিধ আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে যে প্রবল অসহায়ত্ব অনুভব করছে তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভাষিক জাতীয়তাবাদের উত্থান এই-সময়ে স্বাভাবিক, এর পাশাপাশি বাংলায় হিন্দিভাষী শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এ দুটিকে বিরুদ্ধবাদী শক্তি বলেই মনে হয়। হিন্দির সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ববাদ বিরোধী বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বিজেপি, উভয়ই, হিন্দিভাষী শ্রমজীবীদের ‘হিন্দুত্ববাদ’ প্রসারের সামাজিক বাহন হিসেবে মনে করে। ফলে বিরুদ্ধতার বাস্তব ফল খানিকটা বিভ্রান্তিমূলক, প্রকৃতপক্ষে এই দুই প্রবণতা হাতে হাত মিলিয়ে ফ্যাসিবাদী কৌশলের জয়যাত্রায় শক্তি যোগাচ্ছে। শ্রেণীগত ক্রোধ সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়ে প্রকৃত পীড়িত জনসংখ্যার মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি করছে।
বিজেপির বিভেদ ও বর্জনের রাজনীতি দুই ধরনের চাতুরির উপর নির্ভর করে চালিত হয়। একদিকে সে নাগরিকত্বকে পুনঃ সংজ্ঞায়িত করতে চায় শর্তাধীন, অস্থায়ী এবং প্রশাসনিকভাবে মধ্যস্থতা করার মধ্যে দিয়ে, যার সবথেকে বড় উদাহরণ SIR। অন্যদিকে জনপরিসরকে সে পূর্ণ করে দেয় সাংস্কৃতিক জাতীয় ঐক্যের গল্পে। হিন্দি, হিন্দু এবং কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব সব মিলিয়ে এই চালগুলো জনমানসের স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে দেয় এবং তার সম্পূরক পরিচিতি হিসাবে বিজেপি তার জাতীয়তাবাদী পরিচিতির আখ্যানকে তুলে ধরে। মানুষের উচ্ছেদ হবার, অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়ার উদ্বেগকে প্রশমিত করার জন্য এই সাংস্কৃতিক খিচুড়ি এককথায় বিস্ফোরক। এ শুধু সংখ্যালঘুকে প্রান্তিকায়িত করে না, একইসঙ্গে জনচৈতন্যকে পুনঃসংগঠিত করে। পশ্চিমবঙ্গে এই পুনঃসংগঠন এক ধরনের রক্ষণাত্মক জেনোফোবিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশী সন্দেহে আক্রমণ, বাংলাদেশী ভোটারের উপস্থিতির অজুহাতে লাগাতার ধারাবাহিক অত্যাচার, বিজেপি শাসিত প্রদেশগুলোতে বা সংঘের সামাজিকভাবে শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে এমন অঞ্চলে বাঙালি আন্তঃরাজ্য শ্রমিকের উপর ভয়ংকর নিপীড়ন নেমে আসছে, বাংলার মাটিতেও অবাঙালি পশ্চিমা পুঁজির দীর্ঘকালীন শিকড় (যদিও কোন অস্মিতা প্রকল্প এখনো এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারেনি, তা গড়ে তুলতে অবশ্য সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার চেয়ে শ্রমজীবীর শ্রেণি-ঐক্য অধিক প্রয়োজন) এবং অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচনী যাচাই প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক প্ররোচনা তৈরি করে। আগ্রাসী হিন্দিভাষী উত্তরের সঙ্গে বাঙালির ভাষাকেন্দ্রিক বিরুদ্ধতার রাজনৈতিক পদক্ষেপকে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তিযুক্ত বলেই মনে হয়। সেই সাংস্কৃতিক গর্ব বিজেপির একত্ববাদী প্রক্রিয়া, সমসত্ত্ববাদী জাতীয়তা এবং দীর্ঘকালের নিষ্পেষিত ভাষাগত অবদমনের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে একটি বিন্দুতে সন্নিবেশিতও করতে পারে। কিন্তু কোন লহমায় যদি এই প্রতিরোধ ‘ফেডারেলিজমের’ ভাবনা থেকে ‘বর্জনের’ ভাবনায় পর্যবসিত হয়, প্রান্তিকায়িত আন্তঃরাজ্য শ্রমিকদের বা ভিন্নভাষী প্রবাসীদের যদি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের চেয়ে অধিকতর সমস্যা বা মূল সমস্যা বলে মনে হয়, তাহলে সেই ভাবনা তৎক্ষণাৎ ফ্যাসিবাদের তৈরি করা ফাঁদে পা দিচ্ছে বলেই ধরে নিতে হবে। আমরা ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাবো এই ধরনের পরিচিতি-ভিত্তিক শক্তিগুলি শেষ অবধি ফ্যাসিবাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছে। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা তার বড় উদাহরণ। অন্যদিকে হিন্দিভাষী শ্রমজীবী মানুষ, বিভেদের মুখোমুখি হলে ভারতীয় ফ্যাসিজমের ফুট সোলজার হিসেবেই সংগঠিত হবে নিজস্ব নিরাপত্তা বোধ থেকে। একথা অনস্বীকার্য এই অংশকে বিজেপি সংঘটিত করছে নির্বাচনের মাসল- পাওয়ার হিসাবে, সাংস্কৃতিক জোর খাটানোর জন্য চিহ্নিত সম্প্রদায় হিসাবে এবং তাদের জন্মস্থল থেকে দূর দূর শহরে জনবিন্যাসকে বদলে দেবার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু এ কথা একই সঙ্গে সত্যি নিচু তলা থেকে নিযুক্ত এই ফুট-সোলজারদের জন্য তাদের স্বার্থে ঐতিহাসিকভাবে ফ্যাসিবাদ কখনো কিছু করেনি। মনে রাখতে হবে হিন্দিভাষী শ্রমিকেরা ফুট-সোলজার মাত্র। তাঁরা ‘হিন্দুত্ববাদের’ সুবিধাভোগী নয়, হিন্দুত্ববাদের কাছে তারাই সবচেয়ে সহজে খরচা করে দেওয়ার মতো উপাদান। প্রকৃতপক্ষে এই শ্রেণী গভীরতর অনিশ্চয়তার শিকার–ইনফরমালাইজেশন, মজুরি-স্থবিরতা, শ্রমিক স্বার্থের ন্যুনতম সুরক্ষাগুলির বিলুপ্তি এবং অত্যন্ত কঠোর নাগরিক পুলিশি ব্যবস্থার। কল্পিত জাতীয়তায় প্রতীকি অন্তর্ভুক্তি তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেয় না, রাজনৈতিকভাবেও এই শ্রমজীবী অংশ অন্যান্য পরিযান-শ্রমের মতই বিচ্ছিন্ন। ‘হোস্ট’ রাজ্যগুলিতে তাঁরা হিন্দি-হিন্দু- হিন্দুস্তানের প্রতীক হিসাবে এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এর শিকার হন আর নিজস্ব বাসভূমিতে তাঁরা উদ্বৃত্ত শ্রমিক। তাঁদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে সন্নিবেশিত করে আসলে বিজেপি তাদের শ্রেণী-সংহতির সম্ভাবনাকে বিলুপ্ত করে দেয় কিন্তু এর বিনিময়ে তারা স্থায়ী কোন প্রতিদান শাসকের কাছ থেকে পান না।
এগুলো মোটেই আকস্মিক সমাপতন নয়। ফ্যাসিবাদের স্থায়ী শত্রু নির্মার্ণের বৃহত্তর নকশা। কখনো সংখ্যালঘু, কখনো রাজনৈতিক বিরোধী বা কখনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক অভিজাতকে নিজস্ব শৃঙ্খলায় আনার প্রক্রিয়া ফ্যাসিবাদ চালিয়ে যেতে থাকে। সমাজের দরিদ্র অংশ সহজেই তার উদ্দেশ্য সাধনের উপায় হতে পারে। আন্তঃরাজ্য শ্রমিকেরা দৃশ্যমান, নিজ বাসভূমি ছেড়ে তাঁরা এদিকে ওদিকে চলাচল করেন, স্বভাবতই রাজনৈতিকভাবে দুর্বল (বাঙালি বা অন্য যেকোনো আন্তঃরাজ্য শ্রমিকের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য), সুতরাং বলি বানানোর জন্য এরা সবদিক থেকে উপযুক্ত। ইতিহাসে কম উদাহরণ নেই, বাসভূমির সাপেক্ষে অনিশ্চয়তায় থাকা জন-সম্প্রদায়কে সাংস্কৃতিকভাবে উত্তেজিত করে স্বার্থ-সাধনের পর অপরাধী, অনুৎপাদক এবং জাতির বোঝা হিসেবে চিহ্নিত করে খরচ করে দেওয়ার। মতুয়া সম্প্রদায় সাম্প্রতিক উদাহরণ। কী ধরণের শব্দবন্ধ বিজেপি তাঁদের সম্পর্কে প্রয়োগ করছে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। আনুগত্য কখনোই কোনো কর্তৃত্ববাদের থেকে সুরক্ষা আদায়ের পন্থা নয় কারণ কর্তৃত্ববাদ পুঁজির সেবা করে, শ্রমের নয়। এই ট্রাজেডি গভীর রূপ নেয় যখন ভাষিক-আঞ্চলিক প্রতিরোধগুলি রূপান্তরিত হয় জেনোফোবিয়ায়, যখন বাঙালি তামিল মারাঠি অথবা অন্যান্য ভাষিক আন্দোলনগুলি হিন্দি আধিপত্যবাদের সাথে সাথে হিন্দিভাষী শ্রমজীবীকেও তাদের শত্রু চিহ্নিত করে। তখন ফ্যাসিবাদের কাজটিও সহজ হয়ে যায়। কারণ এই শ্রমজীবিরা আরও বেশি বেশি করে কর্তৃত্ববাদী কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন, মনে করেন ফ্যাসিবাদ তাদের রক্ষক। স্থানীয় শ্রমজীবী সমাজের সঙ্গে তাঁদের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। শোষিত হতে থাকা শ্রমজীবী সমাজ তাঁদের পরিচিতির কারণে বিভাজিত হয়ে পড়ে, এই খেলায় পুঁজি এবং রাষ্ট্র অদৃশ্য হয়ে যায়, রাজনৈতিক এনার্জি খরচ হয়ে যায় সাধারণ মানুষের নিজেদের মধ্যেকার লড়াইয়ে।পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় স্মর্তব্য। হিন্দিভাষী শ্রমজীবী ছাড়াও এখানে বিভিন্ন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আরো অন্যভাষার শ্রমজীবী ও অন্যান্য শ্রেণির মানুষ রয়েছেন, রয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা। লড়াই শুধুমাত্র ভাষিক-জাতীয়তাবাদী হলে বিভাজন সম্ভাবনা বাড়ানোর কোন রাস্তাই বিজেপি ছাড়বে না। এছাড়া ঔপনিবেশিক সময় থেকে বাংলার শিল্পায়নে যে হিন্দিভাষী শ্রমজীবীর শ্রম নিযুক্ত হয়েছে তাঁদের উত্তর-প্রজন্মকেও কি বিজেপির দিকে ঠেলে দেওয়া সমীচীন? সমস্যার কেন্দ্র এখানেই। বিজেপি ও সংঘ-পরিবারের প্রকল্প কোন সার্বজনিক মতাদর্শিক রূপান্তর চায় না, আসলে সে চায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভাজিত বিরোধীরা নিজেদের মধ্যে আলাদা আলাদা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং এর ফোকর দিয়ে নিঃশব্দে শর্তাধীন নাগরিকত্ব সহ বিজেপির আরো অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পগুলি রূপায়িত হতে থাকবে। বাংলায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভাজন তো ঘটেইছে, বাংলার জনবিন্যাসের বৈচিত্র্যকে নজরে রেখে আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিচিতির বিভাজনে ভাঙার উদ্দেশ্যেই বিজেপি সচেতনভাবে “বাংলাদেশি” ন্যারেটিভ তৈরি করে অত্যাচার নামিয়ে আনছে। সাম্প্রদায়িক ও ভাষা-জাতিগত বিভাজনের দ্বৈত উদ্দেশ্য এতে সাধিত হচ্ছে।
SIR এর যুক্তিক্রমও আলাদা কথা কিছু বলে না। গণতান্ত্রিক-অংশগ্রহণকে যদি প্রশাসনিক ‘অগ্রাধিকারে’ পরিণত করা যায় তাহলে গণতন্ত্রে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে মানুষের পরিচিতির অবলুপ্তি ঘটে, এবং ওই অংশীদারিত্বের দিগন্ত যদি একবার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ক্রমে সেই জায়গা দখল করতে থাকবে।
সুতরাং প্রকৃত ফ্যসিবাদ বিরোধী লড়াই, পরিচিতির লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে পূর্ণতা পাবার সম্ভাবনা নেই। কর্তৃত্ববাদী পুঁজি এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের দাবি এবং শ্রমজীবী সমাজের সংহতির মাধ্যমেই তা সম্ভব। ভাষিক অধিকারের লড়াই তার বহুত্ববাদী চরিত্রসহ, কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক বর্জনকে প্রশ্রয় না দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। স্থানীয় মানুষের মধ্যেও প্রচার চালাতে হবে কিভাবে ফ্যাসিবাদ তার বিভাজন ও শোষণ চালায়। SIRকে ‘সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র’ হিসাবে ব্যাখ্যা করলে হবে না, গণতন্ত্র ধ্বংসকারী এক প্রকল্প হিসাবে বুঝতে হবে যা বিজেপির অন্যান্য প্রকল্পের মতই মানুষকে বিভাজিত ক’রে ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি হয়েছে। এ কথা নিঃসন্দেহে সত্যি যে এই মুহূর্তে ভাষা জাতি আঞ্চলিকতার মত পরিচিতির ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি জোরদার হবে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী লড়াইতে তা একসময় হাত শক্ত করবে ফ্যাসিবাদেরই। বারবারই অস্মিতা-ভিত্তিক রাজনীতি বিজেপির গ্রাসে চলে গেছে, সামাজিকভাবে তাকে পোক্ত করেছে সংঘ। সুতরাং বাইরে থেকে যতই জঙ্গি দেখাক না কেন, কোন আন্দোলনই সমাজের নিচুতলার সংহতি এবং অন্তর্ভুক্তি ছাড়া সফল হতে পারেনা। শেষ অবধি তা ফ্যাসিবাদের যুক্তিক্রমকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
বিভাজনের যুগে শ্রমজীবী সংহতি
এই আলোচনার শেষে এসে একটা কথা আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না—SIR নিজে কোনও একক ব্যতিক্রম নয়। তা সম্ভব হয়েছে কারণ সমাজ বহুদিন ধরেই খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন এবং গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। ভোটাধিকার আজ এত সহজে প্রশ্নের মুখে পড়ছে, কারণ তার আগেই কাজের অধিকার, বাসস্থানের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সম্মিলিত জীবনের ভিত্তিগুলি ভেঙে পড়েছে। SIR এই ভাঙনের কারণ নয়; সে তার প্রশাসনিক পরিণতি।
গত তিন দশকের নয়া-উদারনৈতিক নীতির ফলে শ্রমজীবী সমাজ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছেন, যেখানে অধিকাংশ মানুষের জীবনই অনানুষ্ঠানিক (informalised), স্থানান্তরিত এবং নথিহীন। স্থায়ী কাজ নেই, স্থায়ী বাসস্থান নেই, স্থায়ী পরিচিতিও নেই। এই পরিস্থিতিতে মানুষ রাজনৈতিক অধিকারকে আর স্বাভাবিক ধরে নিতে পারে না—তাকে বারবার প্রমাণ করতে হয়। এই সামাজিক বাস্তবতাই কর্তৃত্ববাদকে শক্তি জোগায়। ফ্যাসিবাদ ভয় তৈরি করে না; সে আগে থেকেই থাকা ভয়কে সংগঠিত করে নয়া রূপ দেয়।
এই কারণেই SIR-এর মতো প্রকল্প জন-সম্মতি পাচ্ছে এবং কার্যকর হচ্ছে । কারণ মানুষ ইতিমধ্যেই একা। কর্মক্ষেত্রে, বাসস্থানে, শহরে এবং রাজ্যে—সর্বত্র সে বিচ্ছিন্ন। তার অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত, সমস্যা ব্যক্তিগত, লড়াই ব্যক্তিগত। এই বিচ্ছিন্নতাই কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের আসল পুঁজি। বিভক্ত শ্রমজীবী সমাজের উপর প্রশাসনিক শাসন চাপানো সহজ।
সুতরাং ফ্যাসিবাদের মোকাবিলা কেবল কোনও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন দিয়ে সম্ভব নয়। SIR-এর বিরুদ্ধে লড়াই টিকবে না, যদি তার নিচে থাকা সামাজিক বাস্তবতাকে না ছোঁয়া যায়। অর্থাৎ, অনানুষ্ঠানিকতা, নিরাপত্তাহীনতা, উচ্ছেদ এবং স্থায়ী অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া গণতন্ত্র রক্ষা করা অসম্ভব।
এখানেই বামপন্থার প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। আজ প্রশ্নটা আর শুধু ভোটাধিকার রক্ষার নয়, শ্রমজীবী সমাজকে আবার রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে পুনর্গঠনের। এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ নিজেকে একা ভোটার হিসেবে নয়, বরং সম্মিলিত অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে ভাবতে পারেন। যেখানে আন্তঃরাজ্য শ্রমিক, শহুরে ভাড়াটিয়া, অনানুষ্ঠানিক কর্মী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক মানুষ নিজেদের সমস্যাকে আলাদা আলাদা নয়, একটিই কাঠামোগত সংকট হিসেবে চিনতে পারেন।
ফ্যাসিবাদ মানুষের দুর্দশাকে পরিচিতির প্রশ্নে পরিণত করে। বামপন্থার কাজ সেই দুর্দশাকে আবার শ্রেণী ও ক্ষমতার প্রশ্নে ফিরিয়ে আনা। এই পুনর্গঠন সহজ নয়, দ্রুতও নয়। কিন্তু এর বাইরে কোনও স্থায়ী পথ নেই। কারণ যতদিন শ্রমজীবী সমাজ খণ্ডিত থাকবে, ততদিন নাগরিকত্ব শর্তাধীন থাকবে; আর যতদিন নাগরিকত্ব শর্তাধীন থাকবে, ততদিন গণতন্ত্র থাকবে অনিশ্চিত।
এই লড়াইয়ের আসল ক্ষেত্র তাই প্রশাসনিক অফিস নয়, কেবল আদালতও নয়—এর ক্ষেত্র সমাজ নিজেই। কাজের জগৎ, বাসস্থানের প্রশ্ন, পরিযায়নের অভিজ্ঞতা, এবং সেই সব মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক—এই জায়গাগুলিই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্র হিসাবে আবার গড়ে উঠতে পারে, যদি আদৌ ওঠে। ফ্যাসিবাদকে থামাতে হলে আসলে ভেঙে পড়া শ্রমজীবী সমাজের পুনর্গঠন প্রয়োজন।
Editorial Board Member of Alternative Viewpoint
