সীমান্ত জুড়ে গোলাবর্ষণ তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের বিরুদ্ধে “খোলাখুলি যুদ্ধ” ঘোষণা করার পর কেটে গেছে আরও অনেকগুলো দিন।১৭ই মার্চ পাকিস্তানের এয়ার-স্ট্রাইকে কাবুলের একটি ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের ৪০৮ জন রোগী মারা গেছেন,২৬৫ জন আহত।
ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের আফগানিস্তান নীতি কি তাহলে সমস্যার চোরাবালিতে ঘুরপাক খাচ্ছে?এই লড়াই কি শুধুমাত্র এক সীমান্ত সঙ্ঘর্ষ নাকি প্রক্সি রাজনীতির মাধ্যমে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক কৌশল আজ তাকেই প্রত্যঘাত করেছে?
১লা মার্চ ২৬, অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট-এর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের বামপন্থী কর্মী, অধ্যাপক ও সাংবাদিক ফারুক সুলেহরিয়া এই সংকটের একটি সার্বিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেছেন। “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ”-এর উত্তরাধিকার, জিহাদি পৃষ্ঠপোষকতার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-সদৃশ পরিণতি, তালিবান শাসনের মতাদর্শিক চরিত্র এবং বামপন্থীদের কোন কোন অংশের মধ্যে ক্যাম্পিস্ট ভাবনাচিন্তা বর্তমান তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সামরিকবাদ ও ধর্মভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে সুলেহরিয়া যুক্তি দেন যে বর্তমান সংঘর্ষ আসলে আঞ্চলিক ব্যবস্থার আরও গভীর সংকটের প্রতিফলন—যার মূল্য শেষ পর্যন্ত বহন করবে মূলত ডুরান্ড রেখার দুই পাশের শ্রমজীবী মানুষ।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আফগান তালিবান সরকারের বিরুদ্ধে “খোলাখুলি যুদ্ধ” ঘোষণা করেছেন। এই উত্তেজনা কি একটি কৌশলগত বিচ্ছেদ, নাকি এটি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের আফগানিস্তান-সংক্রান্ত নীতির অবসানকে নির্দেশ করে?
ফারুক সুলেহরিয়া: এটি না কোনো কৌশলগত বিচ্ছেদ, না “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” নীতির অবসান। এই ঘোষণা চলমান সংঘাত নিয়ে ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলন। যুদ্ধ ঘোষণা হালকাভাবে করা হয় না; এর আগে নিশ্চয়ই প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে থাকে। অন্যান্য সব পথ শেষ হয়ে যাওয়ার পরই পাকিস্তান সেই তালিবান সরকারকেই প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যাকে একসময় ক্ষমতায় আসতে তারা সহায়তা করেছিল। বড় তামাশার কথা হল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ নিজেই একসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন, যখন তালিবান যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছিল।
গত অক্টোবর থেকে সীমান্ত সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়ে পাকিস্তানের কাবুল ও অন্যান্য শহরের ওপর হামলায় রূপ নিয়েছে। কাতার, তুরস্ক এবং চীন নাকি কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে ৬৫ দফা আলোচনার ব্যবস্থা করেছিল—তবুও টিটিপি (তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান) প্রশ্নের কোনো সমাধান হয়নি। এদিকে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) পাকিস্তানের ভেতরে তাদের হামলা আরও জোরদার করেছে এবং আফগানিস্তানে অবস্থিত নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে তা পরিচালনা করছে। গত বছর প্রায় ১,০০০টি সন্ত্রাসী হামলার খবর পাওয়া গেছে, যার অধিকাংশই টিটিপির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়।
অক্টোবর থেকে পাকিস্তান তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিত করেছে। একটি স্থলবেষ্টিত দেশ হিসেবে আফগানিস্তান ট্রানজিট বাণিজ্যের জন্য পাকিস্তানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল—যার মধ্যে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগও অন্তর্ভুক্ত—এবং গম, সবজি ও ওষুধের মতো অত্যাবশ্যকীয় আমদানির ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করে।
একই সময়ে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র তৎপরতা তীব্রতর হয়েছে। ইসলামাবাদ বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন করার জন্য ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। পাল্টা হিসেব অনুযায়ী তালিবান সরকার নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে,খানিকটা পাকিস্তানের চাপের মোকাবিলা করার জন্যই, ইসলামাবাদের পক্ষে যেটা বেশ হতাশার।
দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তান “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” নীতির নামে আফগান তালিবানদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়াকে ন্যায্যতা দিয়েছে—এই ধারণার ভিত্তিতে যে, ভারতের মতো অনেক বড় শক্তির সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষিতে আফগানিস্তান পাকিস্তানের একটি “বন্ধুসুলভ পশ্চাদ্ভূমি” হিসেবে কাজ করবে। এই যুক্তিই এখনো ইসলামাবাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” ধারণাটি কয়েক দশক ধরে ইসলামাবাদের নীতিকে প্রভাবিত করেছে। এই মতবাদ কি এখন ভেঙে পড়েছে? যদি তা হয়ে থাকে, তবে তার জায়গায় কী আসতে পারে?
ফারুক সুলেহরিয়া: বরং উল্টোটাই মনে হয়—এই ধারণা ভেঙে পড়া দূরস্থান। শাসক-প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ কিছু ভাষ্যকার কাবুলে শাসন পরিবর্তনের এই ধারণা সামনে এনেছেন। ইসলামাবাদ সত্যিই এ ধরনের কোনো পথ সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করছে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন, তবে এই ধরনের চিন্তাকে পুরোপুরি উড়িয়েও দেওয়া যায় না। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান, আফগানিস্তানে অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করে এসেছে।
এই ধরনের কার্যকলাপ বাস্তবানুগ তো নয়ই, এমনকি অনেকসময় আত্মঘাতীও হতে পারে। তবুও “স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ” নিয়ে স্থায়ী—এমনকি বলা যায় একধরনের অবসেসন—রয়েই গেছে। বর্তমান উত্তেজনা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে ইসলামাবাদ কতটা মরিয়া হয়ে তালিবান সরকারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে, যা আর বাধ্য অনুগত প্রক্সির মতো আচরণ করছে না।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: ইসলামাবাদ এই সংকটের কারণ হিসেবে আফগানিস্তান টিটিপির নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র -এই ন্যারেটিভে উপস্থাপন করছে। পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রক্সি যুদ্ধের নীতি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থনের ইতিহাস এই সংঘাতের জন্য কতটা দায়ী?
ফারুক সুলেহরিয়া: এটা ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দানবের এক ক্লাসিক উদাহরণ—অথবা জাদুকরের শিক্ষানবিশির কাহিনির মতো। পাকিস্তান বহুদিন ধরেই ইসলামী মৌলবাদের উৎস এবং তার বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র—উভয়ই। তথাকথিত “আফগান জিহাদ”-এর সময় থেকে—যাকে সমালোচকেরা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে “ডলার জিহাদ” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন—রাষ্ট্র এমন এক ব্যবস্থাকে লালন করেছে, যাকে যথার্থভাবেই “জিহাদ শিল্প” বলা যায়।
প্রথমদিকে এই কাঠামো আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল; পরে তা ভারতের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। কিছু জঙ্গিকে “ভালো তালিবান” এবং অন্যদের “খারাপ তালিবান” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার বিষয়টা বুঝিয়ে দেয় যে এই নীতির ‘অন্তর্নিহিত যুক্তি’ এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: একই সঙ্গে তালিবান সরকারের দায়িত্ব আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? কাবুল কি মতাদর্শগত বা কৌশলগত কারণে সীমান্তপারের সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে—নাকি তা করতে অস্বীকার করেছে?
ফারুক সুলেহরিয়া: আফগান সরকার টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তেমন কিছু করেছে বলে মনে হয় না। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে এই গোষ্ঠীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা তাদের নেই। এখানে মতাদর্শগত ঘনিষ্ঠতা, বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব—সব কিছুই ভূমিকা রাখছে। তালিবানরা কৌশলগতভাবে টিটিপি-কার্ড ব্যবহারও করেছে—পাকিস্তান প্রভাব থেকে মুক্ত স্বায়ত্তশাসনের সংকেত জাহির করে ভারতের মতো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: বর্তমান সংঘাতকে কি মূলত নিরাপত্তা-উদ্বেগ দ্বারা পরিচালিত দুইটি শাসনব্যবস্থার মধ্যে সংঘর্ষ হিসেবে দেখা উচিত—যেগুলোই দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাত দ্বারা প্রভাবিত—নাকি একে কেবল আক্রমণ ও প্রতিশোধের সরল ঘটনায় সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক হবে?
ফারুক সুলেহরিয়া: এটা দুটো বর্বর শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ। কোনো পক্ষই নৈতিক উৎকর্ষ দাবি করতে পারে না। তালিবান সরকার এমন এক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যা কার্যত লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবৈষম্যের সমতুল্য। তারা ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে শাসন করে। তাদের সামাজিক ভিত্তি সীমিত এবং তাও মূলত চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
একই সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক অভিজাততন্ত্র একটা নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে শাসন করে, যেখানে প্রতিটা ক্ষুদ্র বিষয়কেও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যখন দুটো পক্ষই রাজনীতির বদলে বলপ্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন কূটনৈতিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ মানুষকে। ১৯৭৯ সাল থেকে আফগানরা নরকসম পরিস্থিতি সহ্য করে আসছে। পাকিস্তানের মানুষ—বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে—৯/১১-এর পর থেকে তালিবানি হিংসা, রাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মধ্যে আটকে পড়ে বিপুল ভোগান্তির শিকার হয়েছে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ—শীতল যুদ্ধ থেকে শুরু করে ‘ওয়ার অন টেরর’ পর্যন্ত—এই বিপর্যয়ের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, পরবর্তীতে আঞ্চলিক শক্তিগুলো সেটিকে আরও গভীর ও শক্ত করেছে।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে তালিবান অর্থনৈতিক বিপর্যয়, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। এই চাপগুলো পাকিস্তানের প্রতি তাদের অবস্থানকে কীভাবে প্রভাবিত করছে?
ফারুক সুলেহরিয়া: ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার পরই তালিবান পাকিস্তান থেকে নিজেদের দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। তারা বুঝতে পেরেছিল ইসলামাবাদ তাদের বৈধতা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের অধিকারী নয়। পরিবর্তে তারা চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা চালায়—এবং পাকিস্তানের যথেষ্ট বিরক্তি উৎপাদন করে ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করে।
তালিবান কর্মকর্তাদের পাকিস্তানবিরোধী বক্তব্য তাদের দেশীয় রাজনীতিতেও ভালো সাড়া পায়, কারণ পাকিস্তান সেখানে গভীরভাবে জনগণের বিরাগভাজন । এই ধরনের অবস্থান তাদের অভ্যন্তরীণ বৈধতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: বামপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে আজ তালিবান সরকারকে কীভাবে চিহ্নিত করা উচিত?
ফারুক সুলেহরিয়া: কিছু মানুষের মধ্যে তালিবানকে ইসলামো-জাতীয়তাবাদী হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা রয়েছে। তারিক আলির বই The Forty-Year War in Afghanistan এ এই ব্যাখ্যার সমর্থন মেলে। আমি এর সঙ্গে একমত নই। তালিবান ইসলামী মৌলবাদের সবচেয়ে চরম রূপগুলোর মধ্যে একটার প্রতিনিধিত্ব করে।
জাতীয়তাবাদ ভাষা, সংস্কৃতি এবং যৌথ ঐতিহাসিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়। বিপরীতে ইসলামী মৌলবাদ এই সব বিষয়কে শরিয়া দ্বারা পরিচালিত একটি অতিরাষ্ট্রীয় ধর্মীয় ব্যবস্থার অধীনস্থ করে। সংস্কৃতিকে প্রায়ই অপবিত্রতা হিসেবে নিন্দা করা হয়; সংগীত ও নৃত্যকে পাপ বলে গণ্য করা হয়।
কেউ কেউ আবার তালিবানকে শ্রেণিসংগ্রামের এক ধরনের প্রকাশ হিসেবেও তুলে ধরেছেন। এই ভুল ব্যাখ্যাগুলো ৯/১১-এর পর উদ্ভূত ক্যাম্পবাদের প্রাথমিক লক্ষণ ছিল—যেখানে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে কেউ কেউ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর রোমান্টিসাইজেশন ঘটিয়েছেন।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: তালিবান দাবি করে যে তারা আফগান সার্বভৌমত্ব রক্ষা করছে। এই দাবিকে ক্রিটিকালি কীভাবে বিবেচনা করা যায়?
ফারুক সুলেহরিয়া: পাকিস্তান টিটিপির আশ্রয়স্থলগুলোকে তার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে তুলে ধরে; আর তালিবান বিমান হামলাগুলোকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উপস্থাপন করে। সুবিধামতো উভয় পক্ষই আইনের দোহাই দেয়। এই সংঘর্ষ দুটি বর্বর শক্তির।
কেউ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারে, আবার কেউ তার দানবের প্রতিও; কিন্তু শেষ ফলাফল ধ্বংসই। প্রকৃত ভুক্তভোগী হলো দুরান্ড রেখার দুই পাশের সাধারণ মানুষ।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: আঞ্চলিক শক্তিগুলো—চীন, ইরান, রাশিয়া এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো—দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। এই ঘটনাটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়?
ফারুক সুলেহরিয়া: পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলা এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি পাকিস্তান–আফগান সংঘাতকে আড়াল করে দিয়েছে। এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়; এটি জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার দিকেও নির্দেশ করে। জাতিপুঞ্জ।ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক উদারপন্থী ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে ভণ্ডামিপূর্ণ ও সমস্যাসঙ্কুল , কিন্তু ট্রাম্পবাদী বিকল্প আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প পাকিস্তানের আফগানিস্তানের ওপর হামলার প্রশংসা করেছেন।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: উভয় দেশই গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি কীভাবে শ্রেণিগত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত?
ফারুক সুলেহরিয়া: সবসময়ের মতোই শ্রমজীবী শ্রেণিই এর বোঝা বহন করবে—বাস্তুচ্যুতি, বেকারত্ব, সামরিকীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলবে।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: একটি সামরিকীকৃত উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এবং একটি ধর্মতান্ত্রিক শাসনের মধ্যে সংঘাতে বামপন্থার কী নীতি গ্রহণ করা উচিত? কীভাবে বামপন্থা একই সঙ্গে সামরিকতন্ত্র ও ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের বিরোধিতা করতে পারে, অথচ ভূরাজনৈতিক ক্যাম্পবাদের ফাঁদে না পড়ে?
ফারুক সুলেহরিয়া পাকিস্তান প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ না করলে তালিবানকে পরাজিত করতে পারবে না। এটা একটা মৌলিক শর্ত। তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়, এবং আফগান জনগণের প্রতি—বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের মুখে থাকা আফগান নারীদের প্রতি—সংহতি প্রকাশ করা জরুরি।
বামপন্থা ইসলামাবাদ বা কাবুল—কোনো পক্ষের সঙ্গেই নিজেকে একাত্ম করতে পারে না। আমরা যুদ্ধের বিরোধিতা করি এবং ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও জবাবদিহি দাবি করি। তালিবান এবং তাদের আঞ্চলিক বা সাম্রাজ্যবাদী পৃষ্ঠপোষকদের—উভয়কেই—যুদ্ধাপরাধের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
কিছু স্বঘোষিত বামপন্থীকেও মৌলবাদের বিরোধিতার নামে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধিকে সমর্থন করতে দেখাটা বেশ উদ্বেগজনক। এটা সেই মানসিকতার প্রতিফলন, যাকে আমি “অভ্যন্তরীণ ওরিয়েন্টালিজম” বলি—যেখানে এই সংঘাতকে সভ্যতার সংঘর্ষ হিসেবে এক ধরনের জাত্যাভিমানী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়।
অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট: এই সংকট কি আঞ্চলিক নিরাপত্তা-রাষ্ট্রের রাজনীতিকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করছে? পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নাগরিক সমাজের প্রগতিশীল শক্তিগুলোর মধ্যে সীমান্তপারের সংহতির কোনো বাস্তব সম্ভাবনা কি আজও আছে?
ফারুক সুলেহরিয়া: কেবল আফ-পাক সংহতির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে একটি বিস্তৃত উদ্যোগের প্রয়োজন। আফগানিস্তানের ভেতরে নাগরিক সমাজ কঠোর দমন-পীড়নের মুখে, ফলে প্রবাসী নেটওয়ার্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানেও প্রগতিশীল কণ্ঠগুলো প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে।
তবুও এমন একটি উদ্যোগ জরুরি এবং অপরিহার্য। আমাদের পত্রিকা ডেইলি জেদ্দোজেহাদ (সংগ্রাম) এই দিকেই কিছু ছোট কিন্তু প্রাথমিক পদক্ষেপ নেবে। কেবল আঞ্চলিক সংহতি গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা সামরিকতন্ত্র ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়তে পারি।

Farooq Sulehria
Farooq Sulehria is the editor of Daily Jeddojehad. He teaches at Beaconhouse National University, Lahore.