গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি, তেম্পিঅস রেল দুর্ঘটনার ঠিক দুই বছর পর, গ্রিস আবার বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল। ওইদিন ২৪ ঘন্টার সাধারণ ধর্মঘট দেশটিকে স্তব্ধ করে দেয়। তেম্পিঅস-এর সেই কুখ্যাত ট্র্যাজেডিতে ৫৭ জন মারা যান, প্রায় সবাই ছাত্র। কমপক্ষে ৮৫ জন আহত হন। একদিন আগে অর্থাৎ ২৭ শে ফেব্রুয়ারিতে উক্ত রেল দুর্ঘটনার বহু প্রতীক্ষিত তদন্ত রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। জানা যায় যে পদ্ধতিগত সমস্যা এবং প্রায় বাতিল হয়ে যাওয়া পরিকাঠামো ব্যবহারের কারণেই এই ভয়াবহ বিপর্যয়টি ঘটে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল সরকার এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেল সংস্থা OSE (অর্গানিজমস সিদিরদ্রমন এলাদস) কে এই বিপর্যয়ের দায় স্বীকার করতে হবে। ২০১০ সালে গ্রিক সরকার এবং ত্রয়ীর (ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইউরোপীয় কমিশন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) গ্রহণ করা পরিকল্পনার অংশ হিসাবে OSE পুনর্গঠিত হয়। পরের বছর গ্রিক রেলপথের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয় এবং OSE-এর ৫,১৫০ জন কর্মচারীর মধ্যে ২,৩০০ জনেরও অধিক কর্মচারীকে অন্যত্র বদলি করা হয় বা অবসর গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়।
একটি ধূমাবৃত উপত্যকায় ধাতব মৃতদেহের সারি
২০২৩ সালের মার্চের প্রথম দিনটিতে গ্রিক গণমাধ্যমগুলি এথেন্স – তেসালোনিকি রেলপথের মাঝে এক রেলগাড়ির পোড়া দেহাবশেষের চারপাশে উদ্ধারকর্মীদের অবিরাম ব্যাস্ততার চিত্র সম্প্রচার করছিল। তার আগের দিন রাত ১১টার পর তেসালি অঞ্চলে লারিসা শহরের অদূরে তেম্পিঅস-এ ৩৫২ জন যাত্রীবাহী একটি ট্রেনের সঙ্গে এক মালগাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বারো মিনিট ধরে তারা একে অপরের অজান্তেই একই লাইনে মুখোমুখি এগিয়ে আসে। ভয়াবহ এই রেল দুর্ঘটনাটি ২০২৩ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে গ্রিক ইতিহাসের একটি কালো দিনে পরিণত করে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানলে গা শিউরে উঠবে । এই ট্র্যাজেডির এক সপ্তাহ আগে পরিবহন মন্ত্রী কারামানলিস সেদেশের ট্রেন নিরাপত্তার দুর্দান্ত রেকর্ড নিয়ে গর্ব প্রকাশ করছিলেন। অতঃপর প্রকাশিত হয় যে রিমোট কন্ট্রোল এবং লাইট সিগন্যালিং সিস্টেম কোনদিনই কার্যকর করা যায়নি। সর্বোপরি এই সত্যও উদ্ঘাটিত হল যে রেল ইউনিয়নগুলি বহুদিন ধরে সুরক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে অরণ্যে রোদন করেছিল, অবিলম্বে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে যে বড়সড় বিপর্যয় ঘটবে সেকথাও তারা আগাম জানিয়ে রেখেছিল।
রেলপথ নিয়ে সরকারি অবহেলার এই খবর ট্র্যাজেডিটিকে ঘিরে মানুষের আবেগকে অতিশীঘ্র গণ ক্রোধে পরিণত করে। বড় বড় সড়ক নির্মাণ সংস্থা, বেসরকারী বাস (KTEL), ট্রাক পরিবহণ এবং মোটরগাড়ির গাড়ি শিল্পের বিকাশের স্বার্থে সাতের দশক থেকেই গ্রিসের রেল ব্যবস্থা রাজনৈতিক চক্রান্তের প্রধান শিকার। নয়ের দশকের শেষ থেকে জাতীয় রেল সংস্থা OSE কে ভাগ করা শুরু হয় বেসরকারিকরণের সুবিধার্থে। ২০১০-এ বেসরকারিকরণ শুরু হয়। OSE এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পড়ে থাকেন মাত্র ৭৫০ শ্রমিক। এথেন্স-তেসালোনিকি লাইনে যে তথাকথিত আধুনিক ট্রেন চালু করা হয় সেগুলো ছিল বিভিন্ন সমস্যার কারণে বাতিল করা সুইস ফেডারেল রেলসংস্থার ট্রেন। গ্রিসের ঘাড়ে বোঝা নামিয়ে সুইস রেলপথগুলি মুক্তি পেয়েছিল। এতদসত্ত্বেও গ্রিক প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকস মিতসতাকিস সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এই দুর্ঘটনার সমস্ত দায় একজন স্টেশন মাস্টারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই সরকারি মিথ্যাচার ছিল ক্ষতিগ্রস্থদের প্রতি গভীর অবজ্ঞা ও অবহেলার প্রকাশ।
৪১ শতাংশ ভোটের আস্ফালন
কিরিয়াকস মিতসতাকিসের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ডানপন্থী দল নিউ ডেমোক্রেসি ২০২৩ সালের জুন মাসে নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। উদ্ধত সরকার ঘোষণা করে ‘তেম্পিঅস এখন অতীত, আমরা ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছি’। ২০২৩ সালে বসন্তের আইনসভা নির্বাচনে ৪১ শতাংশ ভোটের গল্প দিয়ে নিউ ডেমোক্রেসি ২ বছর ধরে সমস্ত সমালোচনা ও মানুষের দাবিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে গেছে। তারা বিশ্বাস করত যে ২০২৩ মার্চের ক্ষুব্ধ গণ-আন্দোলন এখন অতীত। কিন্তু ওই নির্বাচনে ৪৬ শতাংশ গ্রিক ভোটদান করেন নি। গ্রিসের ইতিহাসে এই নজির বিরল। তা সত্ত্বেও নিজেদের এজেন্ডা দেশের ওপর চাপিয়ে দিতে তারা দুবার ভাবে নি। এই অতি-উদারপন্থী ও ভয়ানক দমনমূলক দক্ষিণপন্থীদের স্লোগান ছিল কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। এই সময়টি ছিল গ্রিসে অতি- দক্ষিণপন্থার রমরমা বাজার।
পরের দুই বছর ধরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলি ন্যায়বিচারের দাবিতে একটি দৃঢ় আন্দোলন গড়ে তোলে। সমস্ত ধোঁয়াশা কাটিয়ে প্রকাশিত হয় যে সরকার এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রকৃত কারণগুলি চেপে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারি অজুহাত ছিল যে রাতের শিফটে থাকা একজন শ্রমিকের “মানবিক ভুল ( human error )”- এর কারণেই এই মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। মালগাড়িতে যে অবৈধভাবে জ্বালানি চোরাচালানের জন্য দাহ্য পদার্থ পরিবহন করা হচ্ছিল, সংঘর্ষের সময় তা বিশাল বিস্ফোরণ ঘটায় সে কথাও বেমালুম চেপে যাওয়া হয়। এই জ্বালানি ব্যবসা বহু “সম্ভ্রান্ত” গ্রিক পুঁজিপতিদের দীর্ঘকালের বিশেষ লাভজনক ব্যবসা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্র্যাজেডির রাতের রেকর্ডিং ফাঁস হয়ে যায়। মর্মান্তিক মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগে এক যুবতীর মৃত্যু-চিৎকার “আমি অক্সিজেন পাচ্ছি না!” ভাইরাল হয়ে যায়।
দক্ষিণপন্থীদের অতি-উদারনৈতিক নীতির আক্রমণ এবং জনগণের দাবির প্রতি চরম অবজ্ঞা সত্ত্বেও আন্দোলন বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে গ্রিক যুবসমাজ বার বার পথে নেমেছে। গ্রিক সংবিধানে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরুদ্ধে গত বছর ছাত্রদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আন্দোলন করে। প্রাক্তন রক্ষণশীল মন্ত্রী কনস্তান্তিনস মিতসতাকিসের পুত্রের “অলৌকিক অর্থনৈতিক অর্জন” নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গদগদ প্রতিবেদনের ছড়াছড়ি আছে। গ্রিক জনতার বড় অংশ ক্ষুব্ধ, তাদের কাছে তথাকথিত এই অর্জন বিশ্বাস্য হয়নি। প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক বাস্তব হল জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং ঋণগ্রস্ত ছোট বাড়ির মালিকদের ভিটে থেকে উচ্ছেদ। হাসপাতালগুলি জরাজীর্ণ। প্রাক্তন টিভি সেলস্ম্যান ও একজন চরম-ডানপন্থী উস্কানিদাতা আদনিস গিওর্গিয়াদিস এখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তার কাজ হল স্বাস্থ্য কর্মীদের ঘাড়ে এই বেহাল অবস্থার দায় চাপিয়ে স্পষ্টতই স্বাস্থ্যসেবার বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করা। স্কুলগুলির অবস্থা তথৈবচ। ওনাসিস জাহাজ কোম্পানির মালিকের ফাউন্ডেশনের হাতে একটি মিনিস্টিরিয়াল স্কুল প্রকল্প তুলে দেওয়া হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের ওপর আক্রমণ অব্যহত এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মালিকদের এই অতি-শোষণের পাশে দাঁড়িয়ে সরকার পুঁজিপতিদের সমস্ত দাবিকে সরকারি প্রকল্পে রূপ দিচ্ছে। এই সমস্ত নোংরা কাজ নিজ হাতে তদারকি করছেন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী কস্তিস হাদজিজাকিস যার একমাত্র লক্ষ্য হল শ্রমিকদের অধিকার হরণ করা। ফোনে আড়িপাতা সহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় কেলেঙ্কারির সাথে মিতসতাকিসের নাম যুক্ত আছে। প্রিডেটর সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে মিতসতাকিস এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিরোধী দল পাসোকের প্রধান, সাংবাদিক এবং এমনকি ডানপন্থী এবং পুলিশের কর্মকর্তা সহ বেশ কিছু লোকের ওপর নজরদারি জারি রেখেছিল। মিতসতাকিস বিষয়টি গোপন করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই ঘটনার লম্বা বিচারপর্ব চলছে। সর্বোপরি এই কেলেঙ্কারিটি প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের ভয়াবহ অভিসন্ধি সম্পর্কে সতর্কতা বিশেষ। গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত অতি-ডানপন্থীদের, যেমন গ্রিক কর্নেলদের জুন্টার প্রাক্তন যুব নেতা মাকিস ভরিদিসের মতো “বিশেষ-মন্ত্রীদের” সম্পর্কে জণগণের তীব্র সংশয়, এরা ৭০-এর দশকে এথেন্সে বামপন্থী ছাত্রদের খুন করত।
এই পটভূমিকায় গত বছরের বিভিন্ন আন্দোলন অনুঘটকের কাজ করেছে। তেম্পিঅস-এর ভাগ্যহতদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে ক্ষোভ আগের মতোই শক্তিশালী রয়ে গেছে। গত অক্টোবরে এথেন্সের পুরানো অলিম্পিক স্টেডিয়ামে তাঁদের প্রতি সংহতিতে অনুষ্ঠিত কানায় কানায় পরিপূর্ণ কনসার্টটি এর প্রমাণ।
আমি অক্সিজেন পাচ্ছি না!
২৬শে জানুয়ারী এই স্লোগান তুলে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলি সমাবেশের ডাক দেয়। তাঁদের ডাকে ব্যাপক সাড়া দিয়ে সারা গ্রিসের কয়েক ডজন শহরে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামেন। দেখা যায় যে কেউই তেম্পিঅস-এর কথা ভোলেন নি। মর্মান্তিক এই স্লোগান সাধারণ মানুষের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস ও অনুভূতি ক্ষোভ হয়ে আছড়ে পড়ার রাস্তা খুলে দেয়। কঠোরতা, কর্তৃত্ববাদ এবং নিপীড়নে শ্বাসরুদ্ধ লক্ষ লক্ষ মানুষ “আমি অক্সিজেন পাচ্ছি না!” এই চিৎকারের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেছেন। “আমি শ্বাস নিতে পারছি না!” মৃত্যুযন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠেছিলেন জর্জ ফ্লয়েড। সেই আর্তচিৎকার যেন লক্ষ কন্ঠে ফিরে এল এথেন্সে, সারা গ্রিসে। মৃত্যুর -প্রাকমুহুর্তে রেলকামরায় মেয়েটির ‘আমি অক্সিজেন পাচ্ছি না’ হয়ে উঠল গ্রিসবাসীর সমূহ আর্তনাদ।
সমাবেশগুলি ছিলো বিশাল কিন্তু নীরব। কিন্তু ২৭শে ফেব্রুয়ারী রিপোর্ট বেরনোর পর ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ট্র্যাজেডির দিনের স্মৃতিতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলির সমাবেশের ডাকের সাথে ইউনিয়নগুলির সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান এবং বামপন্থীদের মানুষকে সংগঠিত করার প্রয়াস এক হয়ে যায়। বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে একটি সার্বিক প্রতিরোধের মঞ্চ প্রস্তুত হয়। এবার আর নীরবে নয় দেশের মানুষ সশব্দে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এই প্রাণবন্ত সাধারণ ধর্মঘট গ্রিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম প্রতিবাদ হিসাবে গণ্য হবে। ২৮ শে ফেব্রুয়ারির পরে ইতিমধ্যে আরও কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে। ৫ ই মার্চ ও ৭ ই মার্চ আবার জনসমাবেশ ঘটেছে।
মিতসতাকিসের মিথ্যাচার!
সরকারি পক্ষ ধরে নিয়েছিল যে তলা থেকে গড়ে ওঠা ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনের দিন শেষ। তারা নিরাপদে ক্ষমতায় থাকবেন ও যথেচ্ছার চালাবেন। ২৮শে ফেব্রুয়ারি তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। এই তারিখ এখন যৌথ স্মৃতির অচ্ছেদ্য অংশ। শুধুমাত্র নীরব শোকের দিন নয় বরং শোককে লড়াইয়ের শপথে রূপান্তরের দিন হয়ে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিনের ঘটনাগুলি নজিরবিহীন। সারা গ্রিসে দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন এবং সারা বিশ্বে হাজার হাজার মানুষ তাঁদের হয়ে গলা ফাটিয়েছেন। স্পষ্ট হয়ে গেছে কিরিয়াকস মিতসতাকিসের সরকার বৈধতা হারিয়েছে।
ব্যাপক সমাবেশ এবং তাতে সাধারণ মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ, প্রতিবাদের শক্তি ও স্পর্ধা তুঙ্গস্পর্শ করেছে। গ্রিস জুড়ে শহর, নগর ও গ্রামে গ্রামে ২৬০টিরও বেশি সমাবেশের আলাদা আলাদা ডাক দেওয়া হয়েছিল। এথেন্স, তেসালোনিকি, পাত্রা, ভলস এবং ইরাক্লিঅনের প্রধান শহরগুলিতে বিশাল সমাবেশগুলো শাসক দলের অন্দরে কাঁপুনি ধরিয়েছে। এই রাজনৈতিক ভূমিকম্প গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে । দেশের উত্তরতম প্রান্তের ইভ্রস থেকে দক্ষিণতম দ্বীপ ক্রিতি পর্যন্ত প্রতিটি শহর, নগর ও ছোট গ্রাম ন্যায়বিচারের দাবিতে ব্যানারে ছেয়ে গেছে। শ্রমিক ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন, উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন, স্থানীয় সংগঠনগুলি দেশের প্রতিটি কোণে রাস্তায় নেমেছে। বাজার হাট বন্ধ থেকেছে, বন্ধ দোকানগুলির দরজায় নোট দিয়ে দোকানিরা জানিয়েছেন যে তাঁরা তেম্পিঅস-এর হাতাহত মানুষগুলির পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দোকান খুলছেন না। বাবা-মায়ের হাত ধরে বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়স্করা লাঠিতে ভর করে দেশের রাস্তা এবং চত্বরগুলিতে অবস্থান করেছেন। ন্যায়বিচারের দাবি আক্ষরিক অর্থে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে।
একইসাথে দেশের বাইরেও গ্রিকদের প্রতি সংহতিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। টোকিও থেকে নিউ ইয়র্ক এবং বুয়েনোস আইরেস থেকে আইসল্যান্ডের আকুরেইরি শহরে – বিশ্বজুড়ে আন্দোলন দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে ১২০টিরও বেশি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সারা ইউরোপ জুড়ে, অভিবাসী গ্রিক ছাত্র, শ্রমিক এবং শিশুরা শহরের কেন্দ্রস্থল বা গ্রিক দূতাবাসের বাইরে প্রতিবাদ করেছেন। সরকারী কর্মকর্তা, প্রতিক্রিয়াশীল টিভি পন্ডিত এবং অতি-দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদরা ভয় পেয়ে চিৎকার করতে শুরু করেছে, “গোটা বিশ্বের চোখে এরা আমাদের দেশকে হেয় করেছে”। সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স এবং দ্য গার্ডিয়ানের মতো বৃহৎ প্রচার মাধ্যমগুলোর কাছে গ্রিসের আন্দোলন হেডলাইন হয়ে গেছে। কুখ্যাত অতি-দক্ষিণপন্থী হাই-প্রোফাইল সরকারী পক্ষগুলো, যারা বিগত দিনে নির্লজ্জভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে গালাগালি করে করে জনগণকে উস্কানোর চেষ্টা করেছিল, তারা চুপচাপ পালানোর পথ খুঁজতে ব্যস্ত।
আন্দোলন এখন অতীত নয়
অতি-দক্ষিণপন্থী আক্রমণের চাপে সামাজিক ও গণ-আন্দোলন দীর্ঘদিন স্তিমিত ছিল। গণঅভ্যুত্থানের এই ব্যাখ্যাতীত অভিজ্ঞতা বামপন্থীদের রাজনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে অনুঘটকের কাজ করেছে। অভূতপূর্ব সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে জনগণ রাস্তায় ফিরে এসেছেন। পুলিশের হিসেব বলছে এথেন্স শহরে ১,৭০,০০০ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি্লেন। অবশ্য পুলিশের হিসাব তো রসিকতা ভিন্ন কিছু নয়। জনসমাবেশ এথেন্সের সিন্দাগমা (গ্রিক সংসদ ভবন) স্কোয়ারের দিকে আসা সমস্ত প্রধান সড়কে ছড়িয়ে পড়েছিল। আশেপাশের ছোট ছোট রাস্তা, স্থানীয় স্কোয়ার এবং গলিগুলি ছিল অবরুদ্ধ। এথেন্সে-সারা দিন ধরে-বিভিন্ন জায়গায়-প্রায় দশ লক্ষ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন –এতে কোন অতিরঞ্জন নেই।
৬-৭ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ অতিক্রম করতে এক ঘন্টা সময় লেগেছিল। সকলেই সিন্দাগমা স্কোয়ারে পৌছতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। অনেকেই সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। কর্তৃপক্ষ সেদিন ড্রোন ওড়ানোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু কিছু ড্রোন-ক্যামেরা অপারেটর ওপর থেকে চমৎকার ছবি তুলে নিয়েছিল শেষ অবধি। তবে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে তোলা ম্যাক্রোস্কোপিক এই ভিডিওগুলোও পুরো ভিড় রেকর্ড করে উঠতে পারেনি।
শ্রমিক ইউনিয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং রাজনৈতিক দলগুলির আনা কয়েক ডজন বড় ব্যানারে এথেন্সের মূল সমাবেশ স্থানটি ভরে উঠেছিল। বাচ্চারা কার্ডবোর্ডে “ন্যায়বিচার” লিখে নিয়ে এসেছিল। বাবা-মায়েরা বাড়িতে তৈরি সাইনবোর্ড হাতে নিয়ে এই অপরাধী সরকারকে অভিযুক্ত করছিলেন। মিতসতাকিসের পদত্যাগের দাবিতে সমাবেশ ফেটে পড়ছিল। ২৬শে জানুয়ারির নীরব সমাবেশের থেকে এর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ।
জনগণ কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলির প্রতি সহানুভূতি দেখাতে আসেন নি, তাঁরা এই দুষ্কৃতী সরকার এবং অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন। গভীরভাবে রাজনৈতিক এক অপরাধের মোকাবিলা করতে ডাক দেওয়া এই সমাবেশে ‘অরাজনীতিকরণের’ চেষ্টা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি পতাকা, নারীবাদী ব্যানার, ফ্যাসিবাদ বিরোধী স্লোগান, ২০২৩ সালে পিলসে গ্রিক কোস্টগার্ডের শত শত শরণার্থী ডুবিয়ে মারার রেসিস্ট নির্মমতার বিরুদ্ধে স্লোগান সমাবেশের মৌলিক দাবিগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১৩ সালে নাৎসি গুন্ডাদের হাতে খুন হওয়া ফ্যাসিস্ট দল ‘গোল্ডেন ডনের’ বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট র্যাপার পাভলস ফিসাসের মা, মাগদা ফিসা, কিরিয়াকি গ্রিভার মা, দেস্পিনা কালেয়া তেম্পিঅসে নিহতদের পরিবারের সমর্থনে সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন। ২০২৪ এ কিরিয়াকি গ্রিভারকে তার প্রাক্তন প্রেমিক এথেন্সের একটি থানার সামনে খুন করে, যে থানায় তিনি সুরক্ষা চাইতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন। এই মুহূর্তে তিনি গ্রিসের নারী আন্দোলনে একজন শহীদের মর্যাদা পান। গ্রিক সংসদের বাইরে সংহতি, সমষ্টিগত অভিব্যক্তি এবং সংগ্রামের একটি মোজাইক প্রদর্শিত হয়েছিল।
‘মৃত’অর্থনীতি সমাজে “প্রতিবাদের” প্রাণসঞ্চার ঘটাল
উপকূলীয় অঞ্চলে সমৃদ্ধশালী আতিকার নাইটক্লাব থেকে শুরু করে দরিদ্রতম পাড়ায় অভিবাসীদের ছোট ছোট দোকানগুলো পর্যন্ত বন্ধ ছিল। ট্যাক্সি চালকরা বিক্ষোভকারীদের বিনামূল্যে গাড়িতে চাপিয়ে বিভিন্ন প্রারম্ভিক পয়েন্ট থেকে এথেন্স শহরের কেন্দ্রস্থলে নিয়ে এসেছিলেন। পরিবহন ইউনিয়নগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা বিকেল ৫টার পর তাদের ধর্মঘট শুরু করবে। তার আগে তারা মেট্রো চালু রাখবে যাতে লোকজন সিন্দাগমায় পৌঁছতে পারে। মেট্রো প্ল্যাটফর্মগুলিতে এত ভিড় হয়েছিল যে ট্রেনে উঠতে মানুষ ৩-৪ টে গাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ধর্মঘটে শ্রমিকদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণের ফলে সবচেয়ে নির্মম মালিকরা এবং প্রধান বহুজাতিক সংস্থাগুলোও সামাজিক চাপ এড়াতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের প্রতি এক ধরনের প্রতীকী “সমর্থন” ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল।
সহিংস দাঙ্গা এবং “দেশকে অস্থিতিশীল” করার পরিকল্পনা চলছে —এইসব ধুয়ো তুলে সরকারি মন্ত্রীরা ভীতিপ্রদর্শনের চেষ্টা একটা করেছিল বটে, তবে তা মাঠে মারা যায়। কোন দ্বিতীয় চিন্তা না করে গণ সমাবেশে ছুটে গিয়েছিল মানুষ । ভয়ের তখন দিক বদল ঘটে গেছে। মঞ্চের বক্তৃতা শেষ হলেই পুলিশ ভিড় ভাঙাতে সহিংস আক্রমণ শুরু করে । ঘন জন-সমাবেশে কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং শতাধিক নাগরিককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। সাংবাদিকরা আহত হন। আশেপাশের গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে পুলিশ বাহিনীর জঘন্য আচরণ জনমানসে ফিরিয়ে আনে অতীতের স্মৃতি, যখন শাসনব্যবস্থা জনসাধারণের ক্রোধকে ভয় পেত। দাঙ্গা-পুলিশের গুন্ডাদের চোখরাঙানি ও পীড়ন উপেক্ষা করে সিনাটান জনতা সিন্দাগমা স্কোয়ারে ফিরে যেতে থাকে, সিন্দাগমা হয়ে ওঠে একটি যুদ্ধক্ষেত্র। এই উস্কানিমূলক নিপীড়নের চরম মুহূর্তটি ছিল সংসদ ভবনের ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপরে জল কামান সহ একটি সাঁজোয়া গাড়ি চালিয়ে দেওয়া। মূলধারার টিভি ভাষ্যকাররাও বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়। ক্যামেরার সামনে এই মাত্রার পুলিশী জুলুম তাদেরও হিসেবের বাইরে ছিল। মানুষ রাত ১১:২০ পর্যন্ত সিন্দাগমা স্কোয়ারে অপেক্ষা করে, দুই বছর আগে ঠিক যে সময় দুটি ট্রেন তেম্পিঅস-এ মুখোমুখি সংঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তারপর সেদিনের কর্মসুচী শেষ হয়।
গ্রিসের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বাঁকবদল এনে দিয়েছে এই প্রতিবাদ । ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ইতিহাস হয়ে গেছে। এই দিন শুধুমাত্র ক্ষোভ প্রকাশের দিন নয়, সংগঠিত হওয়ার ও আগামীর ধারাবাহিক সংগ্রামের সূচনা-বিন্দু। সরকারের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তারা তাদের অসংখ্য অপরাধ এবং নির্মম নয়া- উদারবাদী নীতি প্রয়োগের মূল্য চোকাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ২০২৩ সালে নির্বাচনী ফল (৪১ শতাংশ) প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করে একটি সমৃদ্ধ গ্রিসের ভ্রান্ত কৃত্রিম ছবি সাজিয়ে প্রচার করেছে যে গ্রিক সমাজ “অতীতের বামপন্থী ব্যাধিগুলি” কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। মনগড়া আখ্যান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।
মিতসতাকিস নিজের দ্বন্দ্বে আটকে পড়েছেন। বিমান ও ট্রেন দুর্ঘটনা এবং পরিবহনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গবেষণাকারী জাতীয় সংস্থা তাদের অনুসন্ধান শেষ করেছে। ফলাফল এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে অনুগত ভক্তদের কাছে সত্যের স্বরূপ উন্মোচন করেছে —নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের স্বার্থে তিনি কীভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন। গবেষণার ফলাফল প্রমাণ করেছে কঠোর ব্যায়সঙ্কোচ নীতি রেলে শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে যাত্রী সুরক্ষার বিষয়টিকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। রেল ব্যবস্থায় দিনের পর দিন বরাদ্দ হ্রাস করা থেকে শুরু করে পরিকাঠামোর চরম অবহেলা এই ভয়ানক হত্যাকাণ্ডের রাস্তা চওড়া করেছে। এই দুর্ঘটনায় ব্যায়সঙ্কোচ নীতির পাণ্ডাদের এবং এলেনিক ট্রেন সংস্থার (ট্রেন-পরিচালনাকারী বেসরকারী সংস্থা) হাতের ছাপ স্পষ্ট। কয়েক দশক ধরেই রেল চলাচল ব্যবস্থা কতটা মান্ধাতা আমলে পড়ে ছিল এবং মালগাড়িতে কীভাবে অবৈধ দাহ্য পদার্থ বহন করা হয় তা এই রিপোর্ট থেকে পরিষ্কার। সরকারী অনুসন্ধানও প্রধানমন্ত্রীর “ষড়যন্ত্র তত্ত্ব” কে সরাসরি খারিজ করেছে।
পর্দার বাইরে চলে আসা বিষয়গুলোর রাজনৈতিক মোকাবিলা কীভাবে হবে সেই চিন্তায় গ্রিক সরকারের রাতের ঘুম উড়ে গেছে। সরকারি আধিকারিকরা উল্টোপাল্টা যুক্তি খাড়া করছেন। মন্ত্রীরা দুঃখী দুঃখী মুখ করে পালিয়ে বাঁচার পথ খুঁজছেন। আবার সবচেয়ে নির্মম-দক্ষিণপন্থীরা ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত জনতার প্রতি বিষোদগার চালিয়ে যাচ্ছেন। গভীর আতঙ্ক থেকেই তারা এসব করছেন । অন্যদিকে সংসদীয় বিরোধীরা মানুষের সাহসী লড়াইয়ের মর্যাদা দিতে অক্ষম। এই নীতিই তাদের জনগণের এই প্রতিবাদ – প্রতিরোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এই রাজনৈতিক সার্কাসের ওপর সাধারণ মানুষের আর কোন ভরসা নেই।
সমাজের তলা থেকে সৃষ্ট এই সামাজিক প্রক্রিয়াগুলোর সময়োপযোগী নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারাটা ঠিক এই কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক প্রক্রিয়াগুলিতে আরও বেশি বেশি করে রাজনৈতিক দিশার সন্ধান করা মানুষদের যুক্ত হওয়া দরকার যাতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে র্যাডিক্যাল বাম দিকে বদলে দেওয়া যায়। গ্রিসে এই ধরনের প্রক্রিয়ার বহু অতীত অভিজ্ঞতা আছে।
“আমি অক্সিজেন পাচ্ছি না!” তেম্পিঅসে নিহত মেয়েটির এটাই ছিল শেষ কান্নামাখা আওয়াজ। এই বেদনাদীর্ণ শব্দবন্ধ এখন গ্রিসের প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি কোণে স্লোগান হয়ে উঠেছে। সমাজ নয়া-উদারবাদ এবং কঠোর দমন-পীড়নের শ্বাসরোধী মৃত্যুনিগড় থেকে মরিয়া হয়ে ফেটে বেরতে চায়। স্বাধীনতা ও আশার নিঃশ্বাস তার প্রাপ্য। ২৮শে ফেব্রুয়ারিতে যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের কথা শোনা, তাদের সাথে কথা বলা, সংযোগ স্থাপন করা র্যাডিক্যাল বামপন্থীদের কর্তব্য। সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের সূত্রটি শক্ত করে ধরে রাখা এখন সময়ের দাবি।
Editorial Board Member of Alternative Viewpoint
