হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে মৌখিক দ্বৈরথের পরে জেলেনস্কির দাবি ছিল ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার একটি ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি চুক্তি। বলাই বাহুল্য রাশিয়ার সাথে “শান্তি” চুক্তির যে শর্তাবলী তাকে দেওয়া হয়েছিল তা গলধঃকরণ করা তার জন্য বেশ কষ্টকর ছিল। মার্কিনিদের দেওয়া চুক্তির মূল্য বেশ চড়া। উপরন্তু এই উচ্চমূল্যে কেনা চুক্তি কতটা টেকসই তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
ট্রাম্প জেলেনস্কি সাক্ষাৎকার
দুই রাষ্ট্রপতির অভূতপূর্ব তর্জাটি মনে পড়িয়ে দেয় হিটলার কীভাবে চেকোস্লোভাক এবং অস্ট্রিয়ান সরকারকে যথাক্রমে নিজ নিজ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং পুরো অঞ্চল হস্তান্তর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।এই সাক্ষাৎকার তার নিখুঁত পুনরাভিনয় । জেলেনস্কি ট্রাম্পের নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।কারণ এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ (তেল, গ্যাস, বিরল খনিজ পদার্থ ইত্যাদি) ভাগ করে নেওয়ার পথ খুলে যাবে। এসবই হবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতিকে একপাশে ফেলে রেখে।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে এই বলে সতর্ক করেন যে তিনি ‘শান্তির জন্য শর্ত আরোপ করার মতো অবস্থানে নেই’। তাকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ছেলেখেলা করার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। অবশ্য এই অভিযোগ এমন একজন করছেন যিনি অভিবাসীদের অপরাধীকরণ করে হাত পায়ে শিকল পরিয়ে ফেরত পাঠাচ্ছেন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার নামে উচ্চ শুল্ক আরোপ করছেন এবং একটি সম্প্রসারণবাদী ভূ-রাজনৈতিক কৌশল (কানাডা, গ্রিনল্যান্ডের সংযুক্তি ইত্যাদি) গ্রহণের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করছেন বলে দাবি করছেন।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লায়েন জেলেনস্কির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রশংসায় ভরিয়ে তৎক্ষণাৎ ঘোষণা করেন, ‘দৃঢ় থাকুন, সাহসী হোন, ভয় পাবেন না। প্রিয় রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কি, আপনি কখনোই একা নন।’
এই মুহূর্তে এইভাবেই জেলেনস্কি মার্কিনিদের হুমকি এবং ইউরোপীয়দের সমর্থনের টানাপোড়নের মাঝে দুলছেন।একথা সত্য যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে ১১৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বিনিয়োগ করেছে যদিও ট্রাম্প ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অবাস্তব দাবি করেছেন। কিল ইনস্টিটিউট ফর ওয়ার্ল্ড ইকনমির তথ্য অনুযায়ী এই যুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৩২ বিলিয়ন ইউরো। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে পারেন যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুতিনের আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে ইউক্রেনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক উপস্থিতির গ্যারান্টি দেয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র একটি ক্ষতিপূরণ তহবিলের গ্যারান্টি দিতে রাজি। এর বিনিময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধে মার্কিনিদের বিনিয়োগ করা আর্থিক ও সামরিক সহায়তার জন্য ইউক্রেনকে ৫০ শতাংশ অঞ্চল তাদের হাতে সমর্পণ করতে হবে।
জেলেনস্কির ‘ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি’ চুক্তির অর্থ তাঁর ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউক্রেনে ‘গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব’। এর মানে ইউক্রেনের ওপর তাদের ভোগদখলের পয়লা অধিকার এবং রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের গ্যারান্টি হিসাবে স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি। ট্রাম্প কখনই তা গ্রহণ করবেন না কারণ তিনি তাদের তুলনায় পুতিনের সাথে তার চুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে চান। তিনি একথাও জানেন যে একদিকে জেলেনস্কি ও ইউরোপীয়রা যুদ্ধ চালাতে তার অ্যান্টি-মিসাইল স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে তার প্রধান শত্রু চীনের পাশ থেকে পুতিনকে তিনি নিজের দিকে টেনে আনতে আগ্রহী। এরই মাঝে জার্মানির নতুন রক্ষণশীল চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্টজ ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউরোপের স্বাধীনতা অর্জন’-কে অগ্রাধিকার দিতে বদ্ধপরিকর বলে জানা গেছে।
এই বাতাবরণে লন্ডনে সাম্প্রতিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈঠক, “ কিয়েভে সাহায্যের হাত বজায় রেখে ইউক্রেনের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ দৃঢ রাখতে, আলোচনার টেবিলে ইউক্রেনের স্থান নিশ্চিত করতে এবং যে কোনও শান্তি চুক্তি যাতে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ও ভবিষ্যতের আক্রমণ প্রতিহত করতে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখার “ বিষয়ে সম্মত হয়েছে। যদিও ফরাসী রাষ্ট্রপতি মাক্রঁ ঘোষণা করেছেন যে তারা এক মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতির পক্ষে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেছেন যে এই মুহুর্তে সে ব্যাপারে কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। স্টারমার অবশ্য ট্রাম্পকে চটাতে চাইছেন না যদিও বেশিরভাগ ইউরোপীয় নেতৃত্ব মার্কিনিদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন।
ইউরো – মার্কিন সমীকরণ
খুব অল্প সময়ের মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের এপার ওপারের মধ্যে সম্পর্কের ধরন পালটে গেছে। সমস্ত অর্থেই ইউক্রেনের এই যুদ্ধে পরাজয় হয়েছে। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইউক্রেনের বিষয়ে শান্তি আলোচনার কথা তোলেন। শুরু থেকেই তিনি মস্কোর দুটি প্রধান দাবি মেনে নিয়েছিলেন – কিয়েভের উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা (ন্যাটো) থেকে সদস্যপদ খারিজ এবং ‘নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা’ অনুমোদন। শেষোক্ত দাবির অর্থ চারটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলের পাশাপাশি ক্রিমিয়ার রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্তি। পরের দিন, ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে টেলিফোনে একটি দীর্ঘ বার্তালাপের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে তিনি সৌদি আরবে রুশ নেতার সাথে আলোচনা করতে চান (ইউক্রেন বা ইউরোপীয়দের বাদ দিয়ে) এবং শীঘ্রই ইউক্রেনে নির্বাচন দেখতে চান। এদিকে, ১৪ই ফেব্রুয়ারি, মিউনিখ সুরক্ষা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ইউক্রেন নিয়ে কোন কথা না বলে,তাদের দেশের নাগরিকদের সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করা (প্রকৃতপক্ষে উগ্রদক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে ইউরোপে কোন কোন দেশে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে) বা রাশিয়ার হস্তক্ষেপের দোহাই দিয়ে রোমানিয়ায় নির্বাচন বাতিল করার জন্য ইউরোপীয় নেতাদের সমালোচনা করেন।অথচ সম্মেলনের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ইউক্রেন।
এর আগের সপ্তাহগুলিতে ট্রাম্প কানাডা, মেক্সিকো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আমদানির ওপর কর বাড়িয়ে একটি বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি গ্রিনল্যান্ড দাবি করেন। তাঁর এই আগ্রাসী পদক্ষেপ কেবলমাত্র ‘মিত্রদের’ ওপর অস্ত্র কেনার চাপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি কমানোর বিষয় নয়। সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে বা সেখানে মোতায়েন ইউরোপীয় সৈন্যদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে না বলে চাপ সৃষ্টি করে কার্যত ট্রাম্প ন্যাটো সদস্যের ভৌগলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে মার্কিন সক্রিয়তায় ইতি টানতে চাইছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ থেকে ইউক্রেনে প্রতি বছর গড়ে ৩৫.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের আগে ওয়াশিংটন প্রতি বছর ইসরায়েলকে যে ৩-৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। আফগানিস্তানের সরাসরি দখল কার্যকর করতে এবং বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক ব্যয়ের (২০০১-২০১৯ সময়কালে) প্রায় অর্ধেক তারা ইউক্রেনে ঢেলেছিল। এই সংখ্যাগুলো থেকে বোঝা যায় যে ইউক্রেন মার্কিনিদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের তাতে কিছু আসে যায় না। ইউক্রেনের যুদ্ধ আমেরিকার যুদ্ধ নয়, কেবল তার প্রাক্তন প্রতিদ্বন্দ্বী জোসেফ বিডেনের যুদ্ধ।
হিসাবে ভুল
স্পষ্টতই পশ্চিমা সহায়তার বহর কিয়েভকে বিভ্রান্ত করেছে। রুশদের সাথে আলোচনা প্রত্যাখ্যান করতে উৎসাহিত করেছে। ২০২২ এর বসন্তে, যে সময়ে পশ্চিমারা তাদের কোন সামরিক সহায়তার হাত বাড়ায় নি, ইউক্রেনীয় প্রতিরোধে ক্রেমলিনের দ্বারা দেশের শাসক পরিবর্তনের চক্রান্ত ব্যর্থ হয় এবং ভৌগলিক ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে ইউক্রেন সমর্থ হয়েছিল চার সপ্তাহের লড়াইয়ের পর যুদ্ধরত পক্ষগুলি একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কাছাকাছি আসে। ইস্তাম্বুলে, ইউক্রেন সরকার আটলান্টিক জোটের সদস্যপদ ত্যাগ করে নিরপেক্ষ থাকার অঙ্গীকার করে এবং পারমাণবিক অস্ত্র মজুত না করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। বিনিময়ে ইউক্রেন ২০২২ এর ২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে দখল করা অঞ্চলগুলি ছেড়ে মস্কোর স্বেচ্ছা-প্রত্যাবাসন চেয়েছিল। তবে কিয়েভের পশ্চিমের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু পশ্চিমারা এই শান্তি চুক্তির সম্ভনায় জল ঢেলে দেয়। তাদের মুখপাত্র ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কিয়েভে বলেন যে তিনি কখনই পুতিনের সাথে কোন চুক্তি করবেন না। তাই নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়, পরিবর্তে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করা হবে।
কিছু সময়ের জন্য এই জুয়ার চাল কাজে দেয়। ২০২২ সালের নভেম্বরে কিয়েভ নীপার নদীর দক্ষিণ কূলের খেরসন শহরটি পুনরায় দখল করে। এই বিজয় উচ্ছাসের আবহে ‘আলোচনা’ শব্দটি নিষিদ্ধ কথায় পরিণত হয়। তৎকালে ইউক্রেনের মনোভাব টি ছিল, ১৯৯১ সালের সীমানা বলপূর্বক পুনরুদ্ধার না করে আলোচনা-সমঝোতায় যাওয়া ‘শয়তানের সাথে চুক্তি’ করার সমতুল্য হবে। প্রধান পশ্চিমা গণমাধ্যম ২০২২ সালের অক্টোবরে পুতিনের সাথে আলোচনা নিষিদ্ধ করার যে ইউক্রেনীয় ডিক্রি তা অনুমোদন করে। পুতিনকে যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক বিচারের কাঠগড়ায় তোলার তোড়জোড় শুরু হয়।
কিন্তু ২০২৩ এর জুন মাসে ইউক্রেনের দ্বিতীয়বারের পাল্টা আক্রমণ সফল হয়নি। সংবাদমাধ্যমে মার্কিনিরা তাদের অসন্তোষ ব্যক্ত করে। শত্রুর প্রতিরক্ষাকে ছিন্নভিন্ন করার জন্য এবং রাশিয়া ও ক্রিমিয়ার মধ্যে সেতুটি ভেঙে ফেলার জন্য রুশ দখলীকৃত অঞ্চলে সৈন্য পাঠানোর প্রয়োজন ছিল।বদলে কিয়েভ ছোট ছোট আক্রমণের মধ্যে রণকৌশল সীমাবদ্ধ করে ফেলে। ওয়াশিংটনের চাপে কিয়েভ ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বয়স ২৭ থেকে কমিয়ে ২৫ করে, কিন্তু ডিসেম্বরে তা আরো কমিয়ে ১৮ করতে অস্বীকার করে। পশ্চিমের গালাগাল খেয়ে ইউক্রেন পরবর্তী তে যে সামরিক পদক্ষেপগুলি নেয়, দুঃখজনকভাবে সেগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষের হতাহত হওয়া বা আরও বৃহত্তর সামাজিক আত্মত্যাগ কোন কাজে লাগে নি।
একইসাথে রাশিয়ারও কোন লাভ হয় নি। তাদের ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ সূচনা শেষ অবধি ব্যর্থতায় পরিণত হয়। রুশ গোয়েন্দা সংস্থা ইউক্রেনীয় জনগণ এবং অভিজাতদের মধ্যে রাশিয়ার প্রতি সমর্থন সম্পর্কে অতিরঞ্জিত খবর পরিবেশন করেছিল। সেনাবাহিনী কিয়েভের উপকণ্ঠে থমকে যায় এবং ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়। ক্রেমলিন তার সামরিক শক্তি দনবাস এবং ক্রিমিয়ায় কেন্দ্রীভূত করেছিল। ঝটিকা আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধের মাত্রা এবং প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটে। ২০২২ এর সেপ্টেম্বরে রাশিয়ায় বলপূর্বক সেনাভুক্তির ঘোষণা নাগরিক বিক্ষোভ ও দেশ ছেড়ে পলায়নের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। নিজের যুদ্ধের ফাঁদে আটকা পড়ে রাশিয়ার আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এর উদ্দেশ্য ছিল কিয়েভ সামরিক বলে রুশপন্থী অঞ্চলগুলি ফিরিয়ে নেওয়ার আগে ইউক্রেনের পুনঃশস্ত্রীকরণ রোধ করা এবং ন্যাটোর সম্প্রসারণ বন্ধ করা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় দেশপ্রেম প্রবল আকার নেয়,এবং পশিচমা অস্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দ্বারা সমর্থিত হয়। মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক জোনের সীমান্তবর্তী দুটি নতুন দেশ সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড আটলান্টিক জোটে যোগদান করে। ইউরোপীয়রা জোটের পূর্ব প্রান্তে সেনা সমাবেশ করে বাহিনীর আকার চারগুণ বাড়ায়। পোল্যান্ডে নতুন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র-বিরোধী ঘাঁটির নির্মাণ অব্যাহত থাকে যেখানে দশ হাজার মার্কিন সৈন্য সমবেত হয়। পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া রুশ নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগগুলিকে প্রশমিত করার পরিবর্তে বাড়িয়ে তোলে। নীপারের পূর্বতীরে সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে রাশিয়া শত্রুবাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখে। ২০২৩ সালের মে মাসে বখমুত দখল করতে সক্ষম হয় বহু সৈন্যের প্রাণের বিনিময়ে।
সামরিক ত্রুটি সত্ত্বেও রুশ অর্থনীতি বিস্ময়করভাবে স্থিতিশীল থাকে। রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক পশ্চিমের আর্থিক আগ্রাসন মোকাবিলায় পর্যাপ্ত বিদেশী মুদ্রা গচ্ছিত রাখতে সক্ষম হয়। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্পদ জব্দ করা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে রুবলের মূল্য টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে ও রুশ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে রক্ষা করে। ‘জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা’ ইউরোপেই উল্টো প্রভাব ফেলে। ইউরোপীয় বাজার হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও গ্যাসের ক্রমবর্ধমান দাম রাশিয়াকে ভরসা দেয়। রাশিয়া এশিয়ার বাজারে গ্যাস বিক্রির দিকে মনোনিবেশ করে। তাকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়। যদিও মস্কোকে অস্ত্র ও সৈন্যের জন্য উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মতো ‘ব্রাত্য রাষ্ট্র’গুলির দিকে ঝুঁকতে হয়, তবে কম দামে জ্বালানি কেনায় আগ্রহী লোকের অভাব ছিল না। ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা) রাশিয়ার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞায় আতঙ্কিত হয়ে ডলার-মুক্ত বাণিজ্যের কথা বলতে শুরু করে যদিও তার কার্যকর হওয়া নিয়ে বহু প্রশ্ন আছে। ২০২৪ সালে এই ক্লাবে পাঁচটি নতুন সদস্যকে স্বাগত জানানো হয় যার মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, এই নতুন রুশ তেল ব্যবসার সার্কিটের এক বড় খেলোয়াড়। মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান উত্থান খেলা ঘুরে গেছে।মস্কোর সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনার পথ বেছে নিয়ে ট্রাম্প ক্রেমলিনকে একটি নতুন সমাধানের প্রস্তাব দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাশিয়াকে তাঁর নতুন বন্ধু হিসাবে পেতে চাইছেন। নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা, রাশিয়াকে জি-সেভেন-এ পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। বিভিন্ন ছাড়ের এই মৌখিক আশ্বাসগুলি এককথায় চমকপ্রদ। মার্কিন রাষ্ট্রপতি আগামী সপ্তাহগুলিতে তাঁর সুর নরম করলেও আটলান্টিকের দুই পারের সংহতি এই মুহুর্তে খুবই নরম মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এক ভূ-রাজনৈতিক যুগের অবসান?
এই বিবৃতি ও পালটা-বিবৃতিগুলি ১৯৪৯ সালে শুরু হওয়া একটি ভূ-রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি ঘটাতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, মার্কিনিরা ইউরোপের অর্ধেক অংশে তাদের আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার জন্য আটলান্টিক জোট তৈরি করে। বাকি অর্ধেক ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত শিবির এবং ওয়ারশ চুক্তিতে যোগ দেয়। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে শেষ সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে বহু একতরফা ও অবিবেচনাপ্রসূত ছাড় দিয়েছিলেন। তিনি জার্মানির পুনর্মিলনের এবং তার ন্যাটোর সদস্যপদ গ্রহণ নিঃশর্তে মেনে নিয়েছিলেন। পশ্চিমা জোট পূর্ব ইউরোপে প্রসারিত না করার কোন লিখিত আশ্বাস তিনি নেন নি। পুরানো সামরিক বোঝাপড়াটি এইভাবে ঠাণ্ডা যুদ্ধের পরেও টিকে থাকে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন পূর্বদিকে প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে প্রাক্তন সোভিয়েত বলয়ের দেশগুলি ওয়াশিংটনের সাথে সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করে। ১৯৮৯-৯০ সালে দু-একবার ভাবনাচিন্তা হলেও শেষমেশ সোভিয়েত ব্লকের বিলুপ্তির পর কোনও বিকল্প নিরাপত্তা চুক্তি ব্যবস্থা আবির্ভূত হয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব আংশিকভাবে এরই অভাবের মধ্যে নিহিত এবং এর সাম্প্রতিক নিরসন প্রয়াসটি ইউরোপকে বাদ দিয়ে রুশ- মার্কিন বোঝাপড়া গড়ে তুলেছে।
মিউনিখে ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেমস ডেভিড ভ্যান্স এক কদম এগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে একটি নতুন কৌশলগত মাত্রার দিকে ইঙ্গিত করেনঃ চীনের জোটে ছোট শরিক হওয়া পুতিনের সাজে না। এ কি তবে ১৯৭১ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের ত্রিভুজ কূটনীতির প্রত্যাবর্তন, যখন তিনি তার প্রধান শত্রুকে (সোভিয়েত ইউনিয়ন) আরও ভালভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য সোভিয়েতের ‘ছোট ভাই’ (সেই সময়ে চীন) এর কাছাকাছি এসেছিলেন? এই পরিকল্পনা নিলে ট্রাম্পকে রুশ-চীনা অক্ষের অবসান ঘটাতে কাঠখড় পোহাতে হবে। বেইজিং অবশ্যই এই যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যর্থতার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং পারমাণবিক হুমকির অপব্যবহারের জন্য মস্কোর সমালোচনা করেছে। কিন্তু তার সমর্থন প্রত্যাহার করে নি। চীন বিচক্ষণতার সাথে রাশিয়ার সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। একই সাথে মস্কোর সাথে তার সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর করছে। ভারসাম্যজনিত সমস্যা থাকলেও এই জোটের নেপথ্যে রয়েছে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভাবের আওতায় থাকা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটির বিরুদ্ধে যৌথ ক্ষোভ ও হতাশা।
ইউরোপের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ওয়াশিংটনের নির্দেশে সস্তা রাশিয়ান গ্যাস পরিহার করার ফলে জ্বালানি সংকটে ভুগে তারা ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এদিকে হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য যুদ্ধ ইউরোপীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এরই মধ্যে তারা ইউক্রেনে বিপর্যয়ের পরিণতি একা মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাত তুলে নিয়েছে,এমন এক সময়ে যখন রাশিয়ার সাথে তারা মুখোমুখি দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ। ইউরোপ জরুরী ভিত্তিতে তার সামরিক ব্যয়বৃদ্ধির প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিষ্কারভাবে বলা যায় মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্য তাকে এগিয়ে আসতে হচ্ছে। ওয়াশিংটনের দাবি যুদ্ধের খরচের বোঝা ইউরোপকে ভাগ করে নিতে হবে। এখন তারা দুদিক দিয়ে চাপে পড়েছে। ইউক্রেনের পুনর্গঠনের জন্য অর্থ প্রদান করা (যা রাশিয়া এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ছেড়ে দিতে পেরে খুশি) এবং নিজস্ব নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করা। এই ভার ইউরোপীয় বাজেটের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে যা ওই মহাদেশের অস্থিরতা বাড়াবে বই কমাবে না।
অলিগার্কদের চুক্তি
প্যালেস্টাইনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় শিকার ইউক্রেন। বাহুবলীদের আইনকে মান্যতা দিয়ে পুতিনের সাথে তাঁর জোট বিশ্বব্যাপী মাফিয়া পুঁজিবাদের আধিপত্যের লক্ষণ। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি জনগোষ্ঠী এক প্রহসনের ফাঁদে পড়েছে। এই প্রহসনের হোতার আস্ফালন ও লোভের কোনও সীমা জানা নেই। ২০শে জানুয়ারি তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণের পরে ফাঁদে ফিলিস্তিনিরা, ফাঁদে ইউক্রেনীয়রা।
৪ঠা ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প গাজা ভূখণ্ডে জাতিগত নির্মূলীকরণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফিরে আসার কোনও সম্ভাবনা ছাড়াই ফিলিস্তিনি জনগণকে পাকাপাকিভাবে জর্ডান এবং মিশরে বহিষ্কার করা হবে। এক সপ্তাহ পরে ১২ই ফেব্রুয়ারি ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ৯০ মিনিটের লম্বা টেলিফোন কথোপকথনের শেষে তিনি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কোর আগ্রাসী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব বা ইউরোপীয় শাসকদের বাদ দিয়ে একটি একতরফা মার্কিন-রুশ চুক্তির কথা ঘোষণা করেন।
আট দিনের ব্যবধানে এই দুটি দিনে ফিলিস্তিনি এবং ইউক্রেনীয় জনগণের অধিকারকে একই কৃষ্ণগহ্বরে নিক্ষেপ করা হয়। ভূ-রাজনীতির প্রবাহে একটি সম্পূর্ণ নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত হাওয়ায় ভাসে। এই মুহুর্তগুলি সাম্প্রতিককালের ইউরোপের বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন প্রশাসনের আগ্রাসী আক্রমণের আদর্শগত প্রবণতার সাক্ষী। এই আগ্রাসনের স্পষ্ট লক্ষ্য ইউরোপীয় মহাদেশের ভঙ্গুর সংহতিকে আক্রমণ করা এবং সেখানকার চরম-জাতীয়তাবাদী ও জাতি-বিদ্বেষী উগ্র দক্ষিণপন্থীদের উৎসাহিত করা।
এই মুহুর্তে ইতিহাস দ্রুত গতি কয়েকটি নতুন আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে যা কিছুদিন আগে পর্যন্ত সুদূর সম্ভাবনা বলে মনে হয়েছিল। আমরা এমন দুটি ঘটনা প্রবাহ প্রত্যক্ষ করছি যা আমাদের সমকালের চ্যালেঞ্জের প্রতি মনোনিবেশ করতে বাধ্য করে। প্রথমত আমরা এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছি যেখানে ঠাণ্ডা যুদ্ধের দুই প্রাক্তন প্রতিদ্বন্দ্বী আন্তর্জাতিক আইনকে নির্মূল করতে একজোট হয়েছে। ট্রাম্প ও পুতিন, এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে ভিক্টর অরবান, নরেন্দ্র মোদীর মতো তাদের বিভিন্ন মিত্র ও অবতারদের কোনও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বা রীতিনীতিই মেনে চলার গল্প নেই। কেবলমাত্র গায়ের জোরে নির্মিত ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের হয়ে শেষ কথা বলে। সর্বোপরি, কোনও মৌলিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, তাদের জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া নীতির বিরোধিতা করতে পারে না। ঠিক এমনটাই অ্যাডলফ হিটলার এককালে দাবি করেছিলেন – আমার জনগণের জন্য যা সঠিক বলে আমি মনে করি, তা-ই কেবল তাদের জন্য সঠিক হতে পারে।
সম্ভবত নেপোলিয়নের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই আপ্তবাক্যটি সম্প্রতি এক্স নেটওয়ার্কে ট্রাম্প বার্তা হিসেবে পোস্ট করেছিলেন, ‘যে তার দেশকে উদ্ধার করে সে কোনও আইন ভঙ্গ করে না’। এই সামাজিক নেটওয়ার্কের মালিক ইলন মাস্ক যিনি একজন অনির্বাচিত সহ-রাষ্ট্রপতির মতো আচরণ করেন, অবিলম্বে ১৪টি মার্কিন পতাকা সহ এই বার্তাটি শেয়ার করেন। এটি প্রকৃতপক্ষে শ্বেত-আধিপত্যবাদীদের কোডেড ভাষার ‘১৪ শব্দের’ একটি রেফারেন্স। মূল বাক্যাংশটি হল ‘আমাদের অবশ্যই আমাদের জনগণের অস্তিত্ব এবং শ্বেত-সন্তানদের জন্য একটি ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে’।
ইউক্রেন এবং প্যালেস্টাইনের এই নিদারুণ পরিণতি একটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বিশ্ব এবং বিশ্বজনীন মানবতার ওপর কূটনৈতিক অভ্যুত্থানের চরম নিদর্শন। ইউক্রেন এবং গাজার সংঘাতের মুখে বেশিরভাগ পশ্চিমা নেতাদের দ্বিচারিতা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করে দিয়েছে। ট্রাম্প ঠিক এই সুযোগটাই নিচ্ছেন। বিডেন ও ইউরোপীয় নেতৃত্বের নেতানিয়াহুর আগ্রাসন , তার যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ চোখ বুজে সমর্থন করে যাওয়া পুতিনের জন্য সমর্থনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া একই ভাষায় কথা বলে। যে ভাষার উৎস গায়ের জোর –-তার কোন সীমা বা ছেদ নেই।
ট্রাম্প আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতকে দোষী সাব্যস্ত করে তার বিচারকদের অপরাধী হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছেন। এটা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথার ওপর নিয়ে নেতানিয়াহু এবং পুতিন, উভয়ই আনন্দে থাকতে পারেন। ট্রাম্পের শাস্তির নিশানায় থাকা আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলির তালিকা অন্তহীন। তিনি ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লুএইচও) এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার করেছেন।সমস্ত ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপ করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম বাতিলের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, মানবাধিকার ও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কমিটি সহ জাতিসংঘের (ইউএন) বিভিন্ন সংস্থা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যপদ প্রত্যাহার করা হয়েছে। মানবিক সহায়তা ও উন্নয়নের জন্য ইউএসএআইডি তহবিল স্থগিত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনা হল ট্রাম্পের তাড়াহুড়োয় নেওয়া আরেকটি সিদ্ধান্ত। কলমের একটি খোঁচায় একটি সাধারণ ডিক্রি স্বাক্ষরের সাথে তিনি ১৯৭৭ সালের দুর্নীতিবিরোধী আইন, ‘ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিস অ্যাক্ট’ স্থগিত করেছেন যা মার্কিন সংস্থাগুলিকে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, সর্বোপরি বিদেশে ঘুষ দেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই যে নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্সি একটি মাফিয়া পুঁজিবাদের মূর্ত প্রতীক, ঠিক তার রাশিয়ান মিত্রের মতো। একটি অনিয়ন্ত্রিত, অবাধ পুঁজিবাদ, যেখানে কেবল লোভ, লাভ, সমৃদ্ধি… শাসনের সর্বোচ্চ মন্ত্র।এই মাফিয়া পুঁজিবাদ রাশিয়ান এবং আমেরিকান অলিগার্কদের বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। পুতিন ক্ষমতায় আসার পর যে সেন্ট পিটার্সবার্গ গ্যাং রাশিয়ার সম্পদ দখল করেছে আর সিলিকন ভ্যালির বিলিয়নেয়াররা যারা হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদ কিনেছিল তারা একই আদর্শের যৌথ শরিক।
সমস্ত মাফিয়াদের মতো তাদের একমাত্র বিধান হল অর্থ (সীমাহীন পুঞ্জীভবন) হিংসা (পরিণতিই পন্থার ন্যায্যতা) এবং গোপনীয়তা (সমাজের তত্ত্বাবধান বা নিয়ন্ত্রণের কোনও অধিকার নেই)। ধর্মকে একটি অস্পষ্ট অজুহাত হিসাবে খাড়া করে সংখ্যালঘু, ভিন্নমত ও মতবিরোধের ওপর নিপীড়নকে ন্যায্যতা দান। দুর্বৃত্তরা যেমন নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি করে নেয় তেমনই তারা তাদের স্বার্থ অনুসারে বিশ্বকে বিভক্ত করতে প্রস্তুত। একটি এক্সট্রাক্টিভিস্ট এবং নিষ্ঠুর কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে যার লক্ষ্য ও শিকার প্রকৃতি এবং মানবতা। কাঁচামাল, তেল এবং গ্যাস থেকে ব্যক্তিগত তথ্য, সমস্তটাই এই রুশ ও মার্কিন, উভয় অলিগার্কদের লক্ষ্য। তাদের নিজস্ব নয় এমন সম্পদ মজুত করে প্রয়োজনে চুরি করে নিজেদের পকেট ভরার লক্ষ্য নিয়ে তারা মাঠে নেমেছেন।
তাই এর মোকাবিলা করতেই হবে। সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের ভাষায় ‘এই কঠিন সময়ে, হতাশা কোনও বিকল্প নয়’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সারা পৃথিবীর বামপন্থীদের চরম হতাশা ও নীরবতার মুখে তাঁর মতো মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। ডেমোক্র্যাটদের দ্বিচারিতার বিপরীতে তিনি আরও দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এই চলমান বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি রেখেছেন। সীমাহীন পুঁজিবাদী আধিপত্য এবং লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতার অনিবার্য পরিণতি এই অলিগার্কি।
হিটলার এবং নাৎসিবাদ ইউরোপে অপরিচিত ছিল না। তেমনই ট্রাম্প এবং পুতিন এই তথাকথিত ‘সুখী বিশ্বায়নের’ বিশ্বে অপরিচিত নন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে এই ‘সুখী বিশ্বায়ন’ রূপকথার গল্পের মত পৃথিবী ও প্রকৃতির উপর সর্বজনীন অধিকারকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে বিশ্বব্যাপী পণ্যায়নের সাম্রাজ্য বিস্তার করে। পুঁজিবাদ প্রশ্নবিদ্ধ না হলে তার এই স্বাভাবিক ও অনিবার্য পরিণতি পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। বর্তমানের ঘটনাবলীতে অতীত কখনই একইভাবে পুনরাবৃত্ত হয় না ঠিকই, কিন্তু ইতিহাস সর্বদাই বার্তা বহন করে। বর্তমানের ঘটনাগুলি দুটি ঐতিহাসিক নজিরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতিহাসের পাঠ অতীতে পড়ে থাকবার জন্য নয়, বরং তার সতর্কবার্তা অনুভব করার দায় থেকে যায়। প্রথম নজির ১৯৩৮ এর মিউনিখ চুক্তি –মুখ্য ইউরোপীয় শক্তিগুলি, যথা ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেনের হিটলারের সাম্রাজ্যবাদের কাছে কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণের পরিচায়ক। দ্বিতীয়টি হল ১৯৩৯ সালের জার্মান-সোভিয়েত চুক্তি যা ইউরোপীয় জনগণ, বিশেষত পোল্যান্ড এবং বাল্টিক দেশগুলির মানুষের ভবিষ্যতের বিনিময়ে নাৎসি ও তথাকথিত কমিউনিস্ট শাসকদের দ্বারা স্বাক্ষরিত হয়েছিল। নিশ্চিতভাবেই, মিউনিখ সম্মেলনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের ভাষণ এবং ট্রাম্প-পুতিন চুক্তি ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। এর মূল্য ইউক্রেনীয় জনগণকে দিতে হচ্ছে। মার্কিন সেনেট এবং হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভের রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠরা এই চুক্তিকে কতটা অনুমোদন করবে তা এখনো অজানা। অভূতপূর্ব এবং অপ্রত্যাশিত দিকে এই যাত্রা কতটা ত্বরান্বিত বা বিলম্বিত হবে তা তাদের সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে। একইভাবে ট্রাম্প-পুতিন চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় বিলম্বিত ও অসম্পূর্ণ ইউরোপীয় জাগরণ কী পন্থা নেবে বা নেবে না, তা আমরা এখনও সম্পূর্ণ জানি না। তবে ইতিহাস সাক্ষী, দ্বিধাগ্রস্ততার পরিণতি কী হতে পারে।১৯৩৮-৪০ সালের ঘটনাবলী সেই কথাই মনে করায়,ইউরোপীয় নেতাদের চরম দ্বিধাগ্রস্ততা,তোষণ ও সইয়ে নেওয়ার নীতির মূল্য বিশ্বের জনগণকে কীভাবে চোকাতে হয়েছিল।
পোস্টস্ক্রিপ্ট
অনেকে মনে করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জেলেনস্কিকে আলোচনার টেবিলে যুক্ত করে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একটি শান্তি চুক্তি সম্পাদন করলে এই যুদ্ধ-সমস্যা থেকে সন্তোষজনক নিষ্ক্রমণ ঘটতে পারে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী ইউক্রেনে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে সেদেশে বিদেশী সৈন্য মোতায়েন করা প্রয়োজন। রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের স্বাধীনতার ও সুরক্ষার দাবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেদেশে স্থায়ী সামরিকীকরণের মধ্যে প্রভূত বিপদের সম্ভাবনা আছে। সেখানে সিরিয়া বা প্যালেস্টাইনের মতো ব্যাপক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, সামান্যতম স্ফুলিঙ্গও তৃণভূমিতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।
অবশ্যই এই শান্তি হবে কবরস্থানের শান্তি। ইউরোপীয় এবং মার্কিন শ্রমিকদের জন্য সামাজিক খাতে বাজেট বরাদ্দ থেকে অর্থ চুরি করে ইউক্রেনের ‘শান্তি’ কেনা হবে।
( ইতিপূর্বে এই প্রবন্ধটি অনীক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে)
Editorial Board Member of Alternative Viewpoint
