গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে এক নতুন যুদ্ধের সূচনা হয়েছে। তেহরান সহ একাধিক শহরে বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সামরিক ও কৌশলগত ঘাঁটিগুলি ধ্বংস করা হয়েছে, নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই এবং শাসকগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তি। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ফলে সংঘর্ষ দ্রুত আঞ্চলিক মাত্রা পেতে শুরু করেছে। পারস্য উপসাগরের সামরিক উত্তেজনা, লেবাননের সীমান্ত সংঘর্ষ এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এই যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এই সংঘর্ষকে একটি আকস্মিক সামরিক সংঘাত হিসাবে দেখা ভুল হবে। এটি আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিস্ফোরণ। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য, ইজরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক প্রাধান্য, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সংকট— এতকিছুর সংযোগেই বর্তমান সংঘাতকে বুঝতে হবে।
গত দুই দশকে মার্কিন নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন দেখা গেছে। ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার প্রধান কৌশল ছিল বিশ্বায়ন এবং নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। বর্তমানে সেই নীতির সঙ্গে ক্রমশ সরাসরি সামরিক শক্তির মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাও যুক্ত হয়েছে। যদিও ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠনের মার্কিন পরিকল্পনা স্থিতিশীলতা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতারই জন্ম দেয়। ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান আক্রমণ সেই ধারাবাহিকতারই নতুন পর্ব।
এই জায়গায় ইজরায়েলের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে প্যালেস্তাইনে সামরিক অভিযান, লেবাননের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে ইজরায়েল আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করেছে। ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ করে এই হামলা সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েলের সামরিক প্রাধান্যকে দীর্ঘমেয়াদে অপ্রতিহত করে তোলা।
অন্যদিকে ইরানও গত চার দশকে নিজস্ব এক আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে— ইরাক, লেবানন, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত মানে কার্যত সমগ্র অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে ধাক্কা দেওয়া। এই কারণেই বর্তমান যুদ্ধ কেবল দুটি বা তিনটি রাষ্ট্রের সংঘর্ষ নয়; মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিন্যাসকে নতুন করে নির্ধারণ করার লড়াই।
বিশ্ব পুঁজিবাদী সংকট ও নতুন সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একক বিশ্বশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সেই সময়ে পশ্চিমা রাজনৈতিক ভাষ্যে ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’-র কথা বলা শুরু হয়। এই ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল মূলত নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন— পুঁজির অবাধ বিস্তার, মুক্ত বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সংহতি। অনেকেই বলেছিলেন, বাজারের প্রসার এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংঘাতকে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনবে। কিন্তু এই কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিশ্বায়নের সেই প্রতিশ্রুত স্থিতিশীলতা বাস্তবে খুবই ভঙ্গুর। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট প্রথম বড় ধাক্কা দেয় এই ব্যবস্থাকে। তার পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ঋণ সংকট, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্যের বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান সেই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চরিত্রও ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। বাজার ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল ১৯৯০-এর দশকে প্রাধান্য পেয়েছিল, তার জায়গায় ক্রমশ ফিরে আসে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার সামরিক পুনরুত্থান এবং ইউক্রেন যুদ্ধ সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ফের এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং সামরিক শক্তির রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এই নতুন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, যার কেন্দ্রে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। কারণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস ভাণ্ডার এই অঞ্চলে অবস্থিত। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ— বিশেষত হরমুজ প্রণালী ও সুয়েজ খাল— এই অঞ্চলেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যেও ভীষণ জরুরি।
এর পাশাপাশি গত তিন দশকে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপরেখা অনেকটাই বদলে গেছে। তেল এখনো গুরুত্বপূর্ণ হলেও, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি তেলের উদ্বৃত্ত আয়কে ব্যবহার করে তাদের অর্থনীতিকে বিভিন্ন মাত্রায় পুনর্গঠন করেছে। বিশেষত সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কাতার কিংবা সৌদি আরবের মত রাষ্ট্রগুলি ধীরে ধীরে নিজেদের শুধু জ্বালানি রফতানিকারক অর্থনীতি হিসাবে নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলেছে। দুবাই, দোহা বা রিয়াধ এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আর্থিক পরিষেবা, পর্যটন, পরিবহন এবং উচ্চ প্রযুক্তি পরিকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক পুঁজির প্রবাহ, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন, সমুদ্র বন্দর এবং আর্থিক পরিষেবার জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই শহরগুলি এখন একেকটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কেন্দ্র।
এই রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল কাজ করেছে। তেল থেকে আয়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা যে স্থায়ী নয়, তা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিল। ফলে তারা ওই বিপুল আয়ের একটি অংশ অন্যান্য শিল্পে বিনিয়োগ করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল আজ এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসাবেও কাজ করছে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই প্রেক্ষিতে গত দুই দশকের ঘটনাগুলি যদি একসঙ্গে দেখা যায়, তবে একটি স্পষ্ট ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ, ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ, সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং এখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘর্ষ— সবই মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে দেখা যেতে পারে।
অবশ্য এই প্রচেষ্টা সবসময় পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। ইরাক যুদ্ধের পরবর্তী অস্থিরতা, সিরিয়ার জটিল গৃহযুদ্ধ কিংবা লিবিয়া রাষ্ট্রের ভাঙন দেখিয়েছে যে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রায়ই এমন অনিশ্চিত ফলাফল তৈরি করে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটটি মাথায় রেখে ইরানের বিরুদ্ধে ইজরায়েল-আমেরিকার বর্তমান আক্রমণকে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বুঝতে হবে।
পারমাণবিক প্রশ্ন: অজুহাত, নিয়ন্ত্রণ এবং ভূরাজনীতি
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের প্রধান যুক্তি হল তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ওয়াশিংটনের বক্তব্য— ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার পক্ষে এক গুরুতর বিপদ হয়ে উঠবে। এই যুক্তিই গত দুই দশক ধরে ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক হুমকির প্রধান ভিত্তি।
কিন্তু এই যুক্তির মধ্যে নতুন কিছু নেই। বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বহুব্যবহৃত কৌশল। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন একইভাবে দাবি করেছিল যে সাদ্দাম হুসেনের হাতে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ রয়েছে এবং তিনি পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করতে পারেন। সেই যুক্তিকে সামনে রেখেই ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল। অথচ দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর দেখা যায়, সেই অস্ত্রভাণ্ডারের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ইরানের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি ঠিক এখানেই এসে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তদারকি সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত ইরানের হাতে কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়নি। তবু তাকে কেন্দ্র করে ‘আসন্ন’ বিপদের একটি বয়ান ক্রমাগত নির্মিত হয়েছে কূটনৈতিক আলোচনায়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এবং শেষপর্যন্ত সামরিক অভিযানের যুক্তি হিসাবে।
এই বয়ানের পিছনে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (NPT) মূলত দুটি লক্ষ্য সামনে রেখে তৈরি হয়েছিল— একদিকে নতুন করে রাষ্ট্রগুলির পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন রোধ করা, অন্যদিকে ইতিমধ্যে অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলির ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তবে এই চুক্তি দ্রুত এক ধরনের অসম ক্ষমতার কাঠামোয় পরিণত হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন (পরে রাশিয়া), ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং চীন— এই পাঁচটি রাষ্ট্রকে বৈধ পারমাণবিক শক্তি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে বাকি রাষ্ট্রগুলিকে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। সমস্যা চুক্তির দ্বিতীয় অংশ নিয়ে। অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি। ওটি কোনোদিন বাস্তবায়িত হয়নি। বরং গত কয়েক দশকে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের আধুনিকীকরণ হয়েই চলেছে। NPT ক্রমশ বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থার বদলে পারমাণবিক ক্ষমতার এক ধরনের স্থায়ী শ্রেণিবিন্যাসে পরিণত হয়েছে।
এই দ্বৈত মানদণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। ইজরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে NPT-তে যোগ দেয়নি, তবু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয় এমন একটি পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার তার হাতে রয়েছে। অথচ তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে খুব কমই আলোচিত হয়। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু প্রযুক্তিগত বা সামরিক প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্ন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি অঘোষিত শক্তি ভারসাম্য হল ইজরায়েলের সামরিক প্রাধান্য, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলির অর্থনৈতিক শক্তি এবং ইরানের রাজনৈতিক প্রভাব— এই তিনটি উপাদানের মিশেল। ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা সেই ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
ইরানের মতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তা কৌশল। বহু দশকের নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি এবং আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের দৃষ্টিতে এই কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান শক্তির কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। এই কারণেই ইরানের পারমাণবিক প্রশ্নকে ঘিরে সংঘাত এত দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র। এটি কেবল প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিন্যাস নিয়ে বৃহত্তর ক্ষমতা-দ্বন্দ্বের অংশ।
ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র একটি সামরিক সম্ভাবনার মধ্যে সীমিত নয়। এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানির রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক ব্যবস্থার গভীর অসাম্যের প্রতিফলনও বটে।
মার্কিন-ইজরায়েলি কৌশল: মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রকল্প
ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যকে কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ পর্যন্ত সেই কৌশল মূলত সরাসরি সামরিক শক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা টের পায়— বৃহৎ আকারের সামরিক দখলদারি দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত। এর পরবর্তী পর্যায়ে মার্কিন নীতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। সরাসরি দখলের বদলে লক্ষ্য হয়ে ওঠে আঞ্চলিক শক্তিগুলির মধ্যে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজে তুলনামূলকভাবে কম সরাসরি জড়িয়ে থেকেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। এই কাঠামোর মধ্যে ইজরায়েল ক্রমশ কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে শুরু করে।
ইজরায়েলি রাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক প্রাধান্যকে কোনো অবস্থাতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে না দেওয়া। এই নীতির ঐতিহাসিক উৎস খুঁজলে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৮১ সালে ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরে ইজরায়েলি বিমান হামলা পর্যন্ত একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। সেই হামলার মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল— মধ্যপ্রাচ্যে অন্য কোনো রাষ্ট্র যদি এমন সামরিক সক্ষমতা অর্জন করতে চায় যা ইজরায়েলের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে, তবে তাকে আগেভাগেই ধ্বংস করা হবে।
ইরানের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও তীব্র। কারণ ইরান গত চার দশকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক জটিল প্রভাববলয় তৈরি করেছে। লেবাননে হেজবোল্লা, ইরাকে বিভিন্ন শিয়া রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত করা, সিরিয়ায় আসাদ সরকার এবং ইয়েমেনে হুথি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তেহরান কার্যত একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই নেটওয়ার্ককে ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র— উভয়েই তাদের আঞ্চলিক কৌশলের জন্য সম্ভাব্য বিপদ হিসাবে দেখে। তাই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য কেবল তার পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো নয়। আরও গভীরে গেলে দেখা যাবে, লক্ষ্য হল ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতা ও সামরিক সক্ষমতাকে এমনভাবে দুর্বল করে দেওয়া যাতে সে দীর্ঘ সময় ধরে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এই কৌশলকে অনেক বিশ্লেষক ‘ক্ষমতা ক্ষয়’ (strategic degradation) হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা নয়, বরং তার সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার এমনভাবে ক্ষতি করা, যাতে সে ভবিষ্যতে বড় আকারের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে না পারে।
অন্যদিকে গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখা কঠিন। গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান, লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা এবং সিরিয়ায় ধারাবাহিক বিমান হামলা— এই সমস্ত ঘটনাই একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ধারাবাহিকতার অংশ। প্যালেস্তাইন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে, তা ক্রমশ ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান সামরিক অভিযানকে শুধু একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের একটি নতুন পর্যায় হিসাবেই দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
ইজরায়েলের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হল এমন একটি সংঘাত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে জড়িত। কারণ এতে একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বহুগুণ বাড়ে, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ইজরায়েলের পক্ষে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই সমীকরণ সবসময় অত সহজ নয়। দীর্ঘ যুদ্ধের মানে হল অর্থনৈতিক চাপ, আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা। ফলে ওয়াশিংটনের নীতি প্রায়শই দ্বৈত চরিত্র নেয়— একদিকে সামরিক চাপ বাড়ানো, অন্যদিকে এমন একটি কূটনৈতিক পথ খোলা রাখা যা ব্যবহার করে প্রয়োজনে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা যায়।
এই দ্বৈত কৌশলের মধ্যেই বর্তমান যুদ্ধের রাজনৈতিক যুক্তি নিহিত। ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব নয়— একথা সবাই জানে। কিন্তু তাকে দুর্বল করা সম্ভব এবং সেই দুর্বলতাই মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির নতুন ভারসাম্যের ভিত্তি হতে পারে। এই কারণেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে কেবল একটি সামরিক সংঘাত হিসাবে দেখলে তার প্রকৃত অর্থ ধরা পড়বে না। এটি আসলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলার এক দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অংশ, যেখানে সামরিক শক্তি, আঞ্চলিক জোট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জটিল সমীকরণ একসঙ্গে কাজ করছে।
যদিও এই যুদ্ধের আরেকটি লক্ষণীয় দিক হল উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির সতর্ক দূরত্ব। মার্কিন-ইজরায়েলি জোট যে মাত্রার আঞ্চলিক সমর্থন আশা করেছিল, বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। কাতার প্রকাশ্যে লেবাননে ইজরায়েলি হামলার নিন্দা করেছে এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রও সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে একইসঙ্গে তারা অসামরিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সমালোচনাও করেছে। অর্থাৎ উপসাগরীয় কূটনীতির বর্তমান প্রবণতা স্পষ্ট— ওয়াশিংটনের সামরিক অভিযানকে সরাসরি সমর্থন নয়, আবার তেহরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনও নয়।
তথাকথিত বহুমেরু বিশ্বের সীমাবদ্ধতা
ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে— বিশ্ব কি সত্যিই একটি বহুমেরু যুগে প্রবেশ করেছে? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের যুগ শেষ হয়ে এসেছে এবং তার জায়গায় ধীরে ধীরে একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে। সেখানে চীন, রাশিয়া, ইরান কিংবা ব্রিকস (BRICS)-এর অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলি মিলিয়ে একটি বিকল্প ভূরাজনৈতিক ব্লক তৈরি হতে পারে।
এই ধারণার কারণ হল গত দুই দশকে চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার সামরিক পুনরুত্থান এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির আত্মপ্রকাশের ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কিন্তু এই পরিবর্তনকে একটি সুসংহত রাজনৈতিক বা সামরিক জোট মনে করা অনেকসময় অতিরঞ্জিত হয়ে পড়ে। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘর্ষ সেই সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। কাগজে কলমে ইরান, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে জ্বালানি বাণিজ্য, সামরিক প্রযুক্তি, এমনকি কূটনৈতিক সমর্থনের ক্ষেত্রেও। কিন্তু সেই সহযোগিতা এখন পর্যন্ত কোনো দৃঢ় কৌশলগত জোটে পরিণত হয়নি।
চীনের অবস্থানই এই সত্যকে সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। চীন ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য তেহরানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। তার প্রধান বাজার এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া বেজিংয়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তার কৌশল তাই সাধারণত সংঘাত এড়িয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দিকে ঝুঁকে থাকে, যাতে জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক পথ— দুটিই নিরাপদ থাকে।
রাশিয়ারও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়াকে ইতিমধ্যেই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের পক্ষ নিয়ে সরাসরি বড় আকারের সামরিক অবস্থানে দাঁড়ানোর মত ক্ষমতা বা রাজনৈতিক আগ্রহ রাশিয়ার নেই। রাশিয়া কূটনৈতিক সমর্থন বা সীমিত সামরিক সহযোগিতা দিতে পারে, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া তার ক্ষমতার অতীত।
এই পরিস্থিতিতে তথাকথিত বহুমেরু বিশ্ব অনেকাংশেই একটি পরিবর্তনশীল শক্তি-ভারসাম্যের কল্পনা, দৃঢ় জোটব্যবস্থার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আগের মত একচ্ছত্র না-ও থাকতে পারে, কিন্তু তার বিকল্প হিসাবে কোনো সুসংহত রাজনৈতিক ব্লক এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এক ধরনের মধ্যবর্তী অবস্থায় রয়েছে, যেখানে পুরোনো একমেরু কাঠামো দুর্বল হয়েছে, কিন্তু নতুন বহুমেরু কাঠামো এখনো দৃঢ় হয়নি।
ইরানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামাজিক দ্বন্দ্ব
ইরানের বর্তমান অবস্থা বোঝার জন্য তার নিজের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে বাহ্যিক সংঘাত প্রায়ই আভ্যন্তরীণ সংকটকে নতুনভাবে রূপ দেয়। কখনো তীব্র করে তোলে, আবার কখনো সাময়িকভাবে আড়াল করে দেয়।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল, তার রাজনৈতিক প্রকৃতি শুরু থেকেই দ্বৈত ছিল। একদিকে এটি ছিল রাজতন্ত্রের পতনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি গণঅভ্যুত্থানের ফল; অন্যদিকে সেই বিপ্লব দ্রুত একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলির উপর ধর্মীয় কর্তৃত্বের শক্তিশালী কাঠামো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। সর্বোচ্চ নেতার প্রতিষ্ঠান, বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় পরিষদ— এইসব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এমন এক ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হয় যা একই সঙ্গে রাষ্ট্র, সামরিক শক্তি এবং আদর্শগত নিয়ন্ত্রণের উৎস।
ইরানের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার এক ধরনের ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলি প্রায়ই তুলনামূলকভাবে সংস্কারমুখী নীতি গ্রহণের চেষ্টা করেছে— মোহাম্মদ খাতামি থেকে শুরু করে হাসান রুহানি পর্যন্ত তার উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার মূল কেন্দ্রগুলি থেকে সেই প্রচেষ্টার সীমা নির্ধারিত হয়েছে। ফলে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের স্থায়ী টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে— সংস্কারের সীমিত চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু তা হয়েছে কঠোর রক্ষণশীল নিয়ন্ত্রণের অধীনে।
এই দ্বন্দ্ব কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের গভীর স্তরেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। গত দুই দশকে ইরানে দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষার বিস্তার, নগরায়ন, নারী শিক্ষার প্রসার এবং নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান— এইসব সামাজিক পরিবর্তন রাষ্ট্রের আদর্শিক কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিহীন, ফলে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব দৃশ্যমান। এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায় ২০০৯ সালের ‘গ্রীন মুভমেন্ট’-এ এবং আরও তীব্রভাবে ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনে। মাহসা আমীনীর মৃত্যুর পর তীব্র প্রতিবাদী বিস্ফোরণ কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক ক্ষোভের উদ্গীরণ। তবে ওই আন্দোলনগুলির সীমাবদ্ধতাও ছিল। ওগুলি ইরানি সমাজের গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটালেও এখন পর্যন্ত সুসংগঠিত রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে সমস্ত সংকট সত্ত্বেও রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো টিকে থাকতে পেরেছে।
অর্থনৈতিক সংকট এই দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল থেকে আয়ের ওঠানামা এবং আভ্যন্তরীণ দুর্নীতির ফলে ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি। সামরিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে শুরু হলেও, গত কয়েক দশকে তারা ইরানের অর্থনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র— জ্বালানি, নির্মাণ, পরিকাঠামো— নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। ফলে রাষ্ট্র, সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে এক জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধ এই আভ্যন্তরীণ বিরোধকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ করে দিতে পেরেছে। রাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে সহজেই দমন করতে পেরেছে। একইসঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতি একটি ভিন্ন ধরনের সামাজিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করেছে। জাতীয়তাবোধের উত্থান, বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে সাময়িক ঐক্য। তাই ইরানের এই মুহূর্তের সংকটকে কেবল একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম হিসাবে দেখা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি এটিকে কেবল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিরোধ হিসাবেও ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। বাস্তবতা আরও জটিল।
এই পারস্পরিক ক্রিয়াই ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে নির্ধারণ করছে এবং সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে।
যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ এবং জনগণের রাজনীতি
এই বাস্তবতার মধ্যে স্বভাবতই আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্নটি জটিল হয়ে ওঠে। কারণ এখানে দুটি ভিন্ন ধরনের শক্তি একসঙ্গে উপস্থিত— একদিকে সাম্রাজ্যবাদী সামরিক হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, যার নিজস্ব সামাজিক সীমাবদ্ধতা ও দমননীতিও বাস্তব।
এই দুয়ের মধ্যে যে কোনো একটিকে সমর্থন করা বামপন্থী রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক ফাঁদ। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ানো মানে এমন এক শক্তিকে সমর্থন করা, যার লক্ষ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, বরং ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার। আবার রাষ্ট্রের সমস্ত নীতিকে সমর্থন করাও সমানভাবে সমস্যার, কারণ তা জনগণের সংগ্রামকে অস্বীকার করার সমান। আমাদের একটি স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে, যার ভিত্তি হল বাহ্যিক সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা এবং একইসঙ্গে জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি সমর্থন। যে সংগ্রাম রাষ্ট্রের ভিতর থেকেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এই দ্বৈত অবস্থানের প্রয়োজনীয়তাকে আরও বেশি স্পষ্ট করে। যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ততই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী হবে এবং সামাজিক সংগ্রামের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করবে। আবার যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ সমাজের ভিতরের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি। কোনো বাহ্যিক সামরিক শক্তি কোনো সমাজকে মুক্ত করতে পারে না। ইতিহাসে মুক্তির প্রতিটি প্রকৃত উদাহরণই এসেছে সেই সমাজের মানুষের নিজস্ব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটও তার ব্যতিক্রম নয়। ইরানের জনগণের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার শেষপর্যন্ত তাদের নিজেদেরই। বাহ্যিক সামরিক শক্তি সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তাকে আরও জটিল করে তোলে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও গণতান্ত্রিক সমাধানের প্রশ্ন
একটি বিষয় স্পষ্ট। এই অঞ্চলের অস্থিরতা কেবল সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা রাষ্ট্রের সংঘর্ষের ফল নয়। এর গভীরে রয়েছে দুটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকট, যা কয়েক দশক ধরে পুরো অঞ্চলের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে এসেছে।
প্রথমটি হল প্যালেস্তাইন প্রশ্ন। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে যে সংঘাতের সূচনা, তা আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির কেন্দ্রে রয়ে গেছে। প্যালেস্তিনীয় জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তা শুধু ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমগ্র অঞ্চলের রাজনীতিতে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই প্রশ্নের কোনো ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা কল্পনা করা কঠিন।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাষ্ট্র— ইরান থেকে উপসাগরীয় রাজতন্ত্র পর্যন্ত— এখনো এমন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ, যেখানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র সীমিত এবং রাষ্ট্রক্ষমতা প্রায়শই সংকীর্ণ রাজনৈতিক অভিজাতদের হাতে কেন্দ্রীভূত। এই পরিস্থিতি সামাজিক অসন্তোষ বাড়ায় এবং বাহ্যিক শক্তিগুলির হস্তক্ষেপের সুযোগও তৈরি করে। ফলে ওই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রশ্নটি কেবল ভূরাজনীতির প্রশ্ন নয়; এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রশ্নও। প্যালেস্তাইন প্রশ্নের একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধান এবং একইসঙ্গে ইরান ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলিতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের বিস্তার— এই দুই প্রক্রিয়াই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে।
কারণ শেষপর্যন্ত কোনো অঞ্চলকে স্থিতিশীল করে তোলে সামরিক জোট বা বাহ্যিক শক্তির ভারসাম্য নয়; বরং জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এমন রাজনৈতিক ব্যবস্থাই সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
রচনাটি নাগরিক ডট নেটে ইতিপূর্বে প্রকাশিত।
Editorial Board Member of Alternative Viewpoint
