সাম্প্রতিককালে স্কুলের একটি পাঠ্যবইকে ঘিরে NCERT এবং বিচারব্যবস্থার মধ্যে ঘোর বিতর্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ের একটি অধ্যায়ে ভারতের দুটি বহুল স্বীকৃত সমস্যার উল্লেখ ছিল —মামলার বিপুল জট ও দীর্ঘসূত্রিতা এবং আদালতের ভিতরে দুর্নীতি। প্রতিক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্ট বইটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়, বিষয়বস্তুকে “গভীর আদালত অবমাননাকর” বলে অসন্তোষ প্রকাশ করে। সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই ধরনের পাঠ্য বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে আঘাত করে।
ঘটনাটি শুধু পাঠ্যক্রম-সংক্রান্ত বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আরো বৃহত্তর প্রশ্ন উপস্থিত করে। কোনো গণপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলি কি নাগরিক শিক্ষার আলোচনার মধ্যে তুলে ধরা যায়, নাকি সেগুলিকে অনিবার্যভাবে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবেই দেখা হবে? বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চের সমালোচনার পর NCERT বইটি প্রত্যাহার করে নেয় এবং বিতর্কিত অংশগুলি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে।
যে অংশটি এই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়, তা ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় নতুন কোনো বিষয় নয়। আদালতে মামলার বিপুল জট দীর্ঘদিনের এক পরিচিত বাস্তবতা, এবং বিচারব্যবস্থার সততা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা বহু দশক ধরে সংসদীয় বিতর্ক, আইন কমিশনের প্রতিবেদন ও একাডেমিক গবেষণায় উঠে এসেছে। তবুও সুপ্রিম কোর্টের প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বাভাবিকভাবে তীব্র।
বিতর্কটি আপাতদৃষ্টিতে একটি পাঠ্যবইকে ঘিরে হলেও, তা সমকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা এক গভীর টানাপোড়েনকে উন্মোচিত করে—শিক্ষার মাধ্যমে সরকারি আখ্যান নির্মাণ, প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার প্রশ্ন এবং বিচারব্যবস্থা ও নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে ক্রমপরিবর্তনশীল ভারসাম্য।
সুপ্রিম কোর্টের সর্বাত্মক এই নির্দেশটি আরেক সাংবিধানিক প্রশ্নও উত্থাপন করে — বাক্স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার কর্তৃত্বের সীমা কোথায়। সংবিধানের ১৯(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ সাধারণত “আইন”-এর মাধ্যমেই আরোপ করা হয়। আদালতের কাজ সেই আইন ব্যাখ্যা করা ও প্রয়োগ করা; সাধারণভাবে বাক্স্বাধীনতার ওপর সার্বিক বিধিনিষেধ আরোপ করা তাদের কাজ নয়। এই কারণেই অনেক আইনবিশারদ প্রশ্ন তুলেছেন — শুধু আদালতের কাছে কোনো বিষয়বস্তু আপত্তিকর মনে হয়েছে বলেই কি একটি আদেশের মাধ্যমে কোনো পাঠ্যবইয়ের ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সঙ্গত?
বিচারব্যবস্থার কর্তৃত্ব ও বৈধতার সংকট
রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে বিচারব্যবস্থার অবস্থান কাঠামোগতভাবে স্বতন্ত্র। নির্বাহী বিভাগের মতো তার হাতে প্রশাসনিক যন্ত্র বা বলপ্রয়োগের ক্ষমতা নেই। আদালতের কর্তৃত্ব কার্যকর হয় মূলত তার রায় মান্য করার মধ্য দিয়ে, আর সেই মান্যতা নির্ভর করে বৈধতার ওপর—অর্থাৎ সমাজের এই বিশ্বাসের ওপর যে আদালত ন্যায় ও নিরপেক্ষতার প্রতীক।
এই বৈধতার ওপর নির্ভরতার কারণেই জনবিশ্বাসকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এমন কোন প্রতিপাদ্যের প্রতি বিচারপতিরা বিশেষভাবে সংবেদনশীল। দুর্নীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতার অভিযোগ বিচারব্যবস্থার কর্তৃত্বের ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে — এই জায়গা থেকে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে দুর্নীতির উল্লেখ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অস্বস্তি কিছুটা বোধগম্য। কিন্তু সমস্যা তো শুধু স্পর্শকাতরতায় সীমাবদ্ধ নয়; বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে কোন সমালোচনাকেই যদি অবৈধ বা গ্রহণ-অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে তো আদালত জনপরিসরে কী ধরনের বক্তব্য রাখা যাবে তার সীমানা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নিজেকে স্থাপন করছে।
শিক্ষা ও আখ্যান নির্মাণ
এ কথা অজানা নয় যে রাষ্ট্রের আদর্শগত কাঠামো নির্মাণে পাঠ্যবইয়ের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পাঠক্রম শুধু তথ্য সরবরাহ করে না, রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা নির্মাণ করতেও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নেয়। পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ নাগরিকরা সংসদ, নির্বাহী ও বিচারব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে বুঝতে শেখে এবং কর্তৃত্ব, বৈধতা ও নাগরিকত্ব সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা গড়ে তোলে।
রাষ্ট্র যখন পাঠ্যক্রম সংশোধন করে, তখন তা কেবল পাঠ্যবস্তুর পরিবর্তন ঘটায় না; পাশাপাশি একটি আদর্শগত বয়ানও নির্মাণ করে, যার মাধ্যমে সমাজ তার প্রতিষ্ঠানগুলিকে ব্যাখ্যা করে ও বুঝতে শেখে। গত এক দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ধারাবাহিক সংশোধনের ফলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের উপস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। মধ্যযুগের ইতিহাস, সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু বাছাই করা অংশ হয় সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, নয়তো সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তনগুলি শিক্ষাবিষয়ক বয়ানকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যের কাঠামোর সঙ্গে — আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী বয়ানের সঙ্গে— সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টারই অংশ।
এই ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু এখন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে NCERT-এর পাঠ্যবই নিয়ে বিচারব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নির্বাচিত প্রতিক্রিয়া
পাঠ্যবইয়ের বয়ান বা ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থেকেছে। শিক্ষানীতি মূলত নির্বাহী বিভাগের এক্তিয়ার বলেই বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থার সমস্যার উল্লেখ করার সাথে সাথে আদালত তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
এই বৈপরীত্য এক ধরনের বিশেষ স্পর্শকাতরতার ইঙ্গিত দেয়। ইতিহাসের বয়ান বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে ব্যাখ্যায় সংশোধন বা বিতর্কের সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আদালতের কাছে কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালত বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেই পারে। কিন্তু যদি বিচারব্যবস্থাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে বলে দাবি করা হয়, তবে তা বৃহত্তর গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ — কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই সমালোচনা ও পর্যালোচনার জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা।
রাজনৈতিক রূপান্তর ও আদালত
ভারতীয় রাজনীতিতে বিচারব্যবস্থাকে প্রায়শই নির্বাহী ক্ষমতার একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণার কিছু ভিত্তিও রয়েছে। পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নাগরিক স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত — বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদালত হস্তক্ষেপ করেছে। তবে বিচারব্যবস্থা ও নির্বাহী বিভাগের সম্পর্ককে কেবল সংঘাতের সম্পর্ক হিসেবে দেখাটা যথেষ্ট নয়। বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক রূপান্তরকে আইনি নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা দিতে সাহায্য করেছে।
হাতের কাছে উদাহরণ অযোধ্যা বিতর্ক নিয়ে ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস যে বেআইনি, আদালত তা স্বীকার করে নিয়েও বিতর্কিত জমিটি মন্দির নির্মাণের জন্য দেওয়ার নির্দেশ দেয় এবং মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্যত্র বিকল্প জমি বরাদ্দ করতে বলে।
রায়টি এসেছিল ঐতিহাসিক প্রমাণ ও দখলদারির ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে একটি দেওয়ানি মালিকানা-বিরোধের নিষ্পত্তি হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত ছিল তার রাজনৈতিক প্রভাবে। হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘলালিত পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক দাবিকে এই রায় কার্যত সাংবিধানিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নিষ্পত্তিতে রূপ দিয়েছিল।
এই রায়ের রাজনৈতিক শর্তগুলি আদালত তৈরি করেনি। সেগুলি কয়েক দশক ধরে চলা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল। আদালতের রায়ের কাজ ছিল সেই উদ্ভূত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আইনের কাঠামোর মধ্যে স্থিতিশীল করা। এ ধরনের রাজনৈতিক বিষয়কে আইনি নিষ্পত্তির মাধ্যমে স্থিতিশীল করার কাজ প্রায়ই আদালত করে থাকে। রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আইনি রায়ের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়ে তারা একদিকে বিরোধের অবসান ঘটায়, অন্যদিকে সাংবিধানিক কাঠামোর ধারাবাহিকতাও বজায় রাখে।
বিচারব্যবস্থার দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার অভাব
এই বিতর্ক সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান সম্পর্কেও একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। গণতান্ত্রিক পরিসরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির বৈধতা সাধারণত কোনো না কোনো ধরনের দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে জবাবদিহি করে, আইনসভার সদস্যদের ভোটারদের কাছে একপ্রকার দায়বদ্ধ তো থাকতেই হয় কারণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বিষয় আছে। প্রশাসনিক সংস্থাগুলি আবার নির্বাহী বিভাগের তত্ত্বাবধানে কাজ করে।
বিচারব্যবস্থার অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। বিচারপতিরা নির্বাচিত হন না এবং তারা সরাসরি ভোটারদের কাছেও জবাবদিহি করেন না। ভারতে উচ্চতর বিচারব্যবস্থা বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে কলেজিয়াম পদ্ধতির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষা হিসেবে দাবি করা হয়; কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক কাঠামোও তৈরি করে যেখানে বিচারব্যবস্থাই মূলত নিজেদের নিয়োগ নির্ধারণ করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনে সততা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন উঠলে এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। বিচারব্যবস্থার ভেতরে দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগ সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে সহজে তদন্ত করা যায় না। উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের একমাত্র পথ সংসদীয় ইম্পিচমেন্ট — যার জন্য বিপুল সংখ্যাধিক্যের প্রয়োজন এবং যা বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। ফলে বিচারপতিদের আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগ প্রায়ই এমন অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা পুরোপুরি স্বচ্ছ নয় এবং জনসমালোচনার জন্য উন্মুক্তও নয়।
বর্তমান বিতর্কের একটি লক্ষণীয় দিক হলো—পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের উল্লেখ নিয়ে আদালত আপত্তি জানালেও, এই ধরনের অভিযোগ অভ্যন্তরীণভাবে কীপ্রকারে মোকাবিলা করা হয় সে বিষয়ে কার্যত কোন স্বচ্ছতা নেই। সংসদে দেওয়া উত্তরে দেখা যায়, গত এক দশকে বিচারকদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ বিচারব্যবস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই অভিযোগগুলি কীভাবে পরীক্ষা করা হয়, সেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনও অনেকটাই অস্বচ্ছ।
তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি সম্পর্কে তথ্য জানতে চাওয়া হলে প্রায়ই জানানো হয়েছে যে সেই তথ্য সহজলভ্য নয়, অথবা তা সংগ্রহ করতে গেলে প্রশাসনিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার হবে। ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে অভিযোগের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে স্বীকৃত হলেও তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রক্রিয়াগুলি কার্যত আমাদের নজরের বাইরে থেকে যায়।
বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা বজায় রাখতে তাকে রাজনৈতিক চাপ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়, কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতার ফলেই বিচারব্যবস্থার ওপর কার্যকর সততা ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতে সীমিত স্বচ্ছতা এবং সমালোচনাকে নিরুৎসাহিত করা হলে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব এবং সততা ও দায়বদ্ধতার মধ্যে ব্যবধান আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে সাংবিধানের ব্যাখ্যা ও বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা জনজীবনের ওপর তার প্রভাব বিস্তৃত করেছে। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা নাগরিক স্বাধীনতা — এই সব ক্ষেত্রেই আদালত নিয়মিত রায় দেয়। ফলে রাষ্ট্রপরিচালনার দিকনির্দেশ নির্ধারণে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বিস্তৃত ক্ষমতা এবং সীমিত দায়বদ্ধতার সমন্বয় এক ধরনের সংকট তৈরি করে। আইনের শাসন রক্ষার জন্য বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা অপরিহার্য, কিন্তু সমালোচনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে যেখানে সমালোচনা মাত্রই হুমকি এবং সেকারণেই নিষেধযোগ্য।
NCERT-এর পাঠ্যবই নিয়ে আদালতের প্রতিক্রিয়াকে এই প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। সংশ্লিষ্ট অংশে কোনো নির্দিষ্ট বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি; বরং মামলার জট বা দুর্নীতির অভিযোগের মতো বহুল স্বীকৃত কাঠামোগত সমস্যার উল্লেখ ছিল। তবু আদালতের প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হয়, এই সমস্যাগুলির উল্লেখই যেন প্রতিষ্ঠানের সততাকে বিপন্ন করেছে। এ ধরনের পন্থা স্বল্পমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রতিষ্ঠান তার বৈধতা বজায় রাখে সীমাবদ্ধতা অস্বীকার না করে সেগুলির মুখোমুখি হওয়ার শক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে।
বৈধতা, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বয়ান নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি
গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না; বরং তারা এমন এক বৃহত্তর কাঠামোর অংশ, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা গড়ে ওঠে। এই কাঠামোর মধ্যে বিচারব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলি দ্বৈত ভূমিকা পালন করে। একদিকে তারা বিরোধ নিষ্পত্তি করে এবং সাংবিধানিক নীতির ব্যাখ্যা দেয়। অন্যদিকে তারা রাষ্ট্রের বৈধতা উৎপাদন ও তাকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা পালন করে। আইনি ব্যবস্থার কর্তৃত্ব রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, এক নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যাখ্যা করে, ফলে সামাজিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে সুবিধা হয়।
এই কারণেই রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার প্রশ্ন বিশেষভাবে সামনে আসে। আজকের ভারতে গত এক দশকে এমন এক আদর্শগত ভিত্তিকে সংহত করার প্রক্রিয়া দেখা গেছে, যেখানে জাতীয় পরিচয়, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন ক্রমশ রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ নাগরিকরা রাষ্ট্রকে কীভাবে বুঝবে তার বয়ান অনেকটাই তাদের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। বিশেষ করে স্কুলের পাঠ্যবই বিচারব্যবস্থা, নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলির একটি সহজ সরল চিত্র নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা নেয়।
কিন্তু এই উপস্থাপনাগুলি প্রত্যাশিত ছকের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কথা বললে, তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করে। NCERT-এর পাঠ্যবই নিয়ে আদলতের প্রতিক্রিয়া সেই অস্বস্তির অংশ। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি নিয়ে কোন ধরনের বয়ান চলবে, তার ওপরেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একে দেখা যেতে পারে। ঘটনাটি কেবল বিচারব্যবস্থার স্পর্শ কাতরতার পরিচয় দেয় না; বরং আদর্শগত পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব রক্ষার বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় প্রবণতাকেও সামনে আনে।
এই প্রেক্ষাপটে দেখলে NCERT-এর পাঠ্যবই নিয়ে বিতর্কটি কেবল পাঠ্যক্রম সংক্রান্ত বিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতীয় রাষ্ট্রের ভেতরে একসঙ্গে চলতে থাকা দুটি প্রক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ককে সামনে আনে। প্রথমটি হলো শিক্ষাবিষয়ক বয়ানের ক্রমবর্ধমান দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিকীকরণ। পাঠ্যবই ক্রমশ ইতিহাস ও নাগরিকত্ব সম্পর্কে নির্দিষ্ট আখ্যান নির্মাণের মাধ্যম হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়টি হলো তীব্র মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা। আদালত মরিয়া হয়ে প্রমাণ করতে উদ্যত যে তারা দলীয় রাজনৈতিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে।
নির্বাহী বিভাগের প্রতিক্রিয়া এই ঘটনায় আরেকটি মাত্রা যোগ করে। বিতর্কিত অংশগুলির অন্তর্ভুক্তির জন্য দায়ী ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার কার্যত বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে বয়ান নিয়ন্ত্রণের দাবিকেই জোরদার করেছে। ফলে ঘটনাটি রাষ্ট্রযন্ত্রের দুটি শাখার মধ্যে সরল সংঘাত নয়; বরং এক ধরনের সামঞ্জস্যের চেহারাই দৃশ্যগোচর করে।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা
বিতর্কটি শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কেও একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। পাঠ্যবই কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে কেবল আদর্শ হিসাবে ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি তাদের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরবে?
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্ভর করে নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে সমালোচনামূলকভাবে বিচার করার ক্ষমতার ওপর। বিচারব্যবস্থা, নির্বাহী বিভাগ বা আইনসভা—যে ক্ষেত্রই হোক না কেন, কাঠামোগত সমস্যাগুলি সম্পর্কে সচেতনতা আবশ্যিক কারণ শাসনকাঠামো সংস্কার নিয়ে জনপরিসরে বিতর্কের জন্য সেই সচেতনতাই হল পূর্বশর্ত। এই ধরনের সমস্যার উল্লেখ সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা না হলে নাগরিক শিক্ষার পরিসর সংকুচিত হয়। শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের সরলীকৃত চিত্রেই অভ্যস্ত হয়; ভেতরের টানাপোড়েনগুলি তার অজানাই রয়ে যায়।
উপসংহার
NCERT-এর পাঠ্যবইকে ঘিরে এই বিতর্ককে কেবল পাঠ্যক্রম সংক্রান্ত একটি বিচ্ছিন্ন বিরোধ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি সমকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঘিরে জনপরিসরের বয়ান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক গভীর টানাপোড়েনকে সামনে আনে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, নাগরিক শিক্ষা এবং সাংবিধানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্য ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নগুলি নতুনভাবে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এর মধ্যে বিচারব্যবস্থার অবস্থান বেশ জটিল। একদিকে সে নিজেকে সাংবিধানিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে দেখাতে চায়, আর অন্যদিকে তার অবস্থান আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদ ও তার আদর্শগত শক্তির দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। পাঠক্রমের ক্রমাগত গৈরিকীকরণ এবং ইতিহাস ও তথ্যের অপব্যখ্যা নিয়ে আদালতের কোন তাৎপর্যপূর্ণ হস্তক্ষেপ নেই, শুধু বিচারব্যবস্থার সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রতিক্রিয়া আছে।
সেই অর্থে একটি পাঠ্যবইকে ঘিরে এই বিতর্ক আমাদের শিক্ষা নীতির প্রশ্নের চেয়েও বেশি কিছু বলে, বলে সমকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষমতা, বৈধতা এবং আদর্শগত নিয়ন্ত্রণের আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের কথা ।
Editorial Board Member of Alternative Viewpoint
