গাজা ও বৈশ্বিক দক্ষিণের সংহতির রাজনীতি
২০২৬ সালের ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনের মূল সুর ছিল, ‘স্থিতিশীল, উদ্ভাবনী, সহযোগিতামূলক ও সুস্থায়ী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা’। গত বছর ব্রাজিলের রিও দ্য জেনেইরোয় ১৭তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদী দাবি করেছিলেন, মানবতাকে প্রাধান্য দিয়েই ব্রিকসকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দিল্লির সম্মেলনেও সেই সুরই ফিরে আসে। অর্থাৎ, এই জোট নিজেকে আরো একবার বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রাতিষ্ঠানিক কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল, আধিপত্যের বিরোধিতা, সংহতি এবং আরও ন্যায়সঙ্গত বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থানের কথা বলে।
কিন্তু বৈশ্বিক দক্ষিণের সংহতির এই বার্তা আর বাস্তব রাজনীতির মধ্যে রয়েছে গভীর ফারাক। সম্মেলনের আয়োজক ভারতই ইজরায়েলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র-আমদানিকারক। ভারতের কর্পোরেট সংস্থাগুলির সঙ্গে ইজরায়েলি সংস্থাগুলির যৌথ উদ্যোগে এমন ড্রোনও তৈরি হচ্ছে, যা গাজা ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বৈপরীত্যকে ব্রিকসের প্রকল্পের কোনও বিচ্ছিন্ন বা বিব্রতকর ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা ঠিক না। বরং ব্রিকসের চরিত্র এবং তার সীমাবদ্ধতা বুঝতে এই বৈপরীত্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাজিলীয় মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক রুই মাউরিনি, যিনি নির্ভরশীলতা তত্ত্বের (dependency theory) অন্যতম প্রধান প্রবক্তা, এই ধরনের সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহার করেছিলেন ‘সাব-ইম্পেরিয়ালিজম’ বা উপসম্রাজ্যবাদের ধারণা।
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলিকে তাই সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখা দুষ্কর। বরং এই ব্যবস্থার মধ্যেই তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাওয়া আঞ্চলিক শক্তি। তাদের অর্থনীতিতে কর্পোরেট পুঁজির কেন্দ্রীভবন ও আর্থিকীকরণ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে পণ্য রফতানির উপর নির্ভরতা এবং শ্রমজীবী মানুষের তীব্র শোষণ। অতএব তাদের শাসক শ্রেণির লক্ষ্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা নয়; বরং সেই ব্যবস্থার মধ্যেই নিজেদের জন্য আরও শক্তিশালী জায়গা তৈরি করা।
দক্ষিণ আফ্রিকার মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্যাট্রিক বন্ড ব্রিকসের এই দ্বৈত চরিত্রকে একটি সংক্ষিপ্ত সূত্রে ধরেছেন: ‘Talk left, walk right’, অর্থাৎ ‘কথায় বাম, কাজে ডান’। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, সংহতি এবং আরও ন্যায়সঙ্গত বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে কথা বলা, অথচ বাস্তবে সেই একই বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা – এই বৈপরীত্যই তাঁর সূত্রটির মূল কথা। গাজা সেই বৈপরীত্যকে সবচেয়ে নির্মমভাবে সামনে এনেছে। সেখানে ব্রিকসের কথার সঙ্গে কাজের ফারাকটি আর আড়াল করার উপায় নেই।
সংহতির ভাষা, স্বার্থের রাজনীতি
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত রিও ঘোষণাপত্রকে ব্রিকসের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থানের অন্যতম প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ঘোষণাপত্রে ত্রাণকর্মীদের উপর হামলার নিন্দা ও গাজায় খাদ্যসংকট সৃষ্টি করে সেখানকার বাসিন্দাদের অনাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার কৌশলেরও তীব্র সমালোচনা করা হয়। পাশাপাশি, সেখানে অবিলম্বে স্থায়ী ও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয় এবং ইরানের উপর চালানো সামরিক হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের লঙ্ঘন বলে নিন্দা করা হয়।
কিন্তু ঘোষণাপত্রের এই বক্তব্যগুলির সঙ্গে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির বাস্তব কর্মকাণ্ড মিলিয়ে দেখলে ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইজরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে থাকা ব্রিকসের দশটি সদস্যরাষ্ট্র1 এক দিকে সংহতির কথা বলেছে, অন্য দিকে সেই সম্পর্কও বজায় রেখেছে। ফলে ঘোষণাপত্রের কূটনৈতিক ভাষা তাদের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের ফারাকটিকেই আড়াল করেছে।
সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুলা তাঁর বক্তৃতায় গাজায় গণহত্যার কথা বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই শব্দটিই ঘোষণাপত্রে জায়গা পায়নি। কারণ ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির কর্পোরেট সংস্থাগুলির একাংশ ইজরায়েলকে অস্ত্র, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করে। তাই ঘোষণাপত্রে ‘গণহত্যা’ শব্দটি রাখা এবং একই সঙ্গে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সহজ ছিল না। গাজা নিয়ে ঘোষণাপত্রের ভাষা চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ আলোচনা চলে। গাজায় কী ঘটছে, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল না। বিতর্ক ছিল সেই বাস্তবতাকে কী ভাষায় ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা হবে, যাতে কোনও সদস্য দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থে সরাসরি আঘাত না লাগে।
শেষ পর্যন্ত ঘোষণাপত্রে জায়গা হল ‘গভীর উদ্বেগ’-এর মতো এক কূটনৈতিক শব্দবন্ধের। ‘গভীর উদ্বেগ’ আসলে এক ছলচাতুরির ভাষা যা গাজার পরিস্থিতি নিয়ে দায়সারা অবস্থান ঘোষণা করে, কিন্তু ‘গণহত্যা’ শব্দটি এড়িয়ে যায়। কারণ শব্দটি উচ্চারণ করলে যে রাজনৈতিক ও আইনি দায়ের মুখোমুখি হতে হয়, সেই দায় নিতে ব্রিকস প্রস্তুত ছিল না। অথচ রুশ ভূখণ্ডে ‘ইউক্রেনের হামলা’র নিন্দা করতে ঘোষণাপত্র কোনও দ্বিধা দেখায়নি; একই সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রসঙ্গটি পাশ কাটিয়ে গিয়েছে। ঘোষণাপত্রের এই বাছাই তাই ব্রিকসের প্রতিটি সদস্যের স্বার্থের সীমারেখা কোথায় টানা, তার একেবারে স্পষ্ট মানচিত্র।
ব্রিকসের পরবর্তী সভাপতি এবং নিজেকে বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরা ভারত এই দ্বিচারিতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলির একটি। রিও শীর্ষ সম্মেলনের কিছু দিন আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদে গাজা নিয়ে আনা একটি প্রস্তাবে নয়াদিল্লি ভোটদানে বিরত ছিল। অথচ সেই প্রস্তাবের মানবিক ভাষাই পরে জায়গা করে নেয় ব্রিকসের রিও ঘোষণাপত্রে। রাষ্ট্রপুঞ্জে যে ভাষার পক্ষে ভোট দিতে ভারত পিছিয়ে গেল, রিও-তে সেই ভাষাতেই সীলমোহর দিল; আর একইসাথে ইজরায়েলের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ণ রাখল। অর্থাৎ, গাজার মানুষের দুর্দশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশে ভারত আপত্তি করছে না, আপত্তি সেখানে, যেখানে সেই উদ্বেগকে বাস্তব নীতিতে পরিণত করার প্রশ্ন আসে। এই বৈপরীত্য নিছক ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অসঙ্গতি নয়; ব্রিকসের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থানের অন্তর্নিহিত সীমাটিও এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সদস্য রাষ্ট্রগুলি জনমতের সামনে যতটা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী হতে হয়, ততটাই; নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে তার বেশি নয়।
আয়োজক দেশই আদর্শ উদাহরণ
SIPRI-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৫ সময়ে ভারতের অস্ত্র আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ এসেছে ইজরায়েল থেকে। ভারতের অস্ত্রবাজারে ইজরায়েল ছিল তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী। অন্য দিকে, ইজরায়েলের মোট অস্ত্র রফতানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি গিয়েছে ভারতে; অর্থাৎ ইজরায়েলের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় একক বাজার ভারত। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পরেও এই অস্ত্রবাণিজ্যে কোনও ছেদ পড়েনি।
ইজরায়েল অন্যান্য দেশের ১৫০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করলেও, ভারতের ক্ষেত্রে এই সরবরাহ জারি ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গাজা আক্রমণের কারণে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য কমানোর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছিল। সেই সময় ইজরায়েল ভারতের দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়ে, আর ভারতও ইজরায়েলি অস্ত্রের অন্যতম প্রধান ক্রেতা হিসেবে তার ভূমিকা বজায় রাখে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুই সরকার প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও গভীর করতে একটি নতুন সমঝোতাপত্রে সই করে।
এটি কেবল দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অস্ত্র কেনাবেচার সম্পর্ক নয়; দুই দেশের পুঁজির মধ্যেও গড়ে উঠেছে ঘনিষ্ঠ জোট। আদানি গোষ্ঠী এবং ইজরায়েলি সংস্থা এলবিট সিস্টেমসের যৌথ উদ্যোগ ২০১৬ সাল থেকে হায়দরাবাদে হার্মিস ৯০০ ড্রোন তৈরি করছে। এই এলবিটই অধিকৃত প্যালেস্টাইনে দেওয়াল ও চেকপয়েন্টে নজরদারির জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি সরবরাহ করে। অন্য দিকে, আদানি গোষ্ঠী হাইফা বন্দর পরিচালনা করে, যে বন্দর দিয়ে ইজরায়েলের যুদ্ধ অর্থনীতির প্রয়োজনীয় সরবরাহ পৌঁছয়।
হিন্দুত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী এবং জায়নবাদের আদর্শগত ঘনিষ্ঠতা এই সম্পর্কের একটি দিক মাত্র। কিন্তু তার জন্য আলাদা কোনও ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। সম্পর্কটির বস্তুগত ভিত্তিই যথেষ্ট: ভারতের শাসক জোটের কাছে ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুঁজি সঞ্চয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দমন-পীড়নের কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কোনও শীর্ষ সম্মেলনের সরকারি ঘোষণাপত্র এই সম্পর্কের সেই বস্তুগত ভিত্তিকে বদলে দিতে পারে না। অথচ এই ভারতই সেপ্টেম্বরে ‘মানবতাকে প্রাধান্য’ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্রিকসের সভাপতিত্ব করেছে।
গোটা জোটের হিসাব
ভারত এই দ্বিচারিতার সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ, কিন্তু কোন ব্যতিক্রম নয়। গণহত্যার সঙ্গে ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলির যোগসূত্র কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; তাদের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেই তার ভিত্তি রয়েছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ন্যায় আদালত গাজায় গণহত্যার সম্ভাব্যতার কথা বলার পরেও, ইরান ছাড়া প্রায় প্রতিটি ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রই ইজরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়েছে। সেই বাণিজ্যের বড় অংশ ছিল জ্বালানি ও সামরিক পণ্য। অর্থাৎ, গাজায় ইজরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর সঙ্গেই ব্রিকসের বহু সদস্যের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অটুট ছিল।
চিন ও ভারত হাইফার বেসরকারি কনটেনার টার্মিনাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। এই বন্দর ইজরায়েলের সামরিক সরঞ্জাম আমদানির গুরুত্বপূর্ণ পথ; গাজায় ব্যবহৃত হাজার হাজার চিনা-নির্মিত ড্রোনও এই বাণিজ্যিক পরিকাঠামোর পথ ধরে আসে। কলম্বিয়ার নিষেধাজ্ঞার পর দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া ও চিনের কয়লা ইজরায়েলের বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা সচল রাখছে; ব্রাজিলের অপরিশোধিত তেলও মেটাচ্ছে তার জ্বালানি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ। অর্থাৎ, ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যিক নয়; বন্দর, অস্ত্র, কয়লা ও তেলের মাধ্যমে সেই সম্পর্ক ইজরায়েলের যুদ্ধ অর্থনীতির প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোকেও সচল রাখছে।
আন্তর্জাতিক ন্যায় আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলাটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। প্যালেস্টাইনের পক্ষে এই মামলা এবং হেগ গ্রুপে প্রিটোরিয়ার সক্রিয় ভূমিকা ২০২৩ সালের পর রাষ্ট্রীয় স্তরে সংহতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু এই পদক্ষেপকে দক্ষিণ আফ্রিকার সামগ্রিক পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যনীতির পরিচায়ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একই সময়ে দেশটির শাসক শ্রেণি ইজরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও জারি রেখেছে। প্যালেস্টাইনের পক্ষে আইনি লড়াই এবং ইজরায়েলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক – এই দুই বিপরীতমুখী বাস্তবতাই একই রাষ্ট্রের নীতির অংশ।
মপুমালাঙ্গা থেকে ইজরায়েলে যাওয়া কয়লা সরবরাহ করে গ্লেনকোর এবং আফ্রিকান রেনবো মিনারেলস। দ্বিতীয় সংস্থাটির চেয়ারম্যান সেদেশের রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসার বিলিয়নেয়ার ভগ্নীপতি প্যাট্রিস মোটসেপে। ১ লক্ষ ৭৭ হাজার টন কয়লার একটি চালান থেকেই তাঁর প্রায় ১০ লক্ষ ডলার লাভ হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। আন্তর্জাতিক ন্যায় আদালতে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং একই সময়ে ইজরায়েলের যুদ্ধ অর্থনীতিতে কয়লা সরবরাহ করা – এই দুই বাস্তবতার ফারাকেই দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও তার শাসক শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এটিকে নিছক নৈতিক ব্যর্থতা বলে ‘ভণ্ডামি’ আখ্যা দেওয়াও যথেষ্ট নয়। বরং এটাই সম্ভবত উপসম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য: এক দিকে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়ের ভাষায় নিজের বৈধতা নির্মাণ করে, অন্য দিকে তার শাসক শ্রেণি সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার মধ্যেই পুঁজির স্বার্থে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে বস্তুগত সম্পর্ক বজায় রাখে। এই বৈপরীত্য ব্যক্তিগত নৈতিকতার নয়; রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র এবং পুঁজির প্রয়োজনের মধ্যেই তার ভিত্তি।
প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরেও একই দ্বন্দ্ব
গাজাকে ঘিরে যে দ্বন্দ্ব ব্রিকসের রাষ্ট্রগুলির নীতিতে দেখা যায়, তার প্রতিফলন মেলে জোটটির প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেও। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক (NDB) এবং কনটিনজেন্ট রিজার্ভ অ্যারেঞ্জমেন্ট (CRA)-কে এক সময় বিকল্প আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এক দশক পরেও CRA পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। NDB-র ক্ষেত্রেও ছবিটা খুব আলাদা নয়: এটি মূলত ডলারেই ঋণ দেয়, পশ্চিমী ক্রেডিট-রেটিং সংস্থাগুলির মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেয়; এমনকি নিউ ইয়র্কের রেটিং বজায় রাখতে রাশিয়ার ২০ শতাংশ অংশীদারিত্বও সাময়িক ভাবে স্থগিত করা হয়। বিশ্বব্যাঙ্ক ও IMF-এর বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে NDB শেষ পর্যন্ত সেই একই পশ্চিমী আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছে।।
বরং ব্রিকস এখন ব্রেটন উড্সের দুই প্রধান প্রতিষ্ঠানকেই শক্তিশালী করার কাজে মনোনিবেশ করেছে। কাজান ও রিও ঘোষণাপত্রে ‘কোটা-ভিত্তিক এবং পর্যাপ্ত সম্পদসমৃদ্ধ’ IMF-এর প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। অথচ CADTM-এর বিশ্লেষণ দেখায়, IMF-এ আমেরিকার একার ভোটের অংশ ১৬.৪৯ শতাংশ, আর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন ৮৫ শতাংশ ভোট। তার মানে ওয়াশিংটনের হাতেই কার্যত ভেটো ক্ষমতা। ব্রিকস তাই IMF-এর কাঠামো বদলে দেওয়ার বদলে সেই কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের জন্য আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের দাবি জানাচ্ছে – এমন এক ব্যবস্থায়, যার ক্ষমতার ভারসাম্য এখনও ওয়াশিংটনের পক্ষে।
এরিক তুস্যাঁ দেখিয়েছেন, রিও ঘোষণাপত্রের ১২৬টি দফায় এক বারও ‘ডি-ডলারাইজেশন’ – অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লেনদেনে ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর – কথা নেই। পুতিনও স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্রিকস ‘ডলার পরিত্যাগ করতে চায়নি’। বাস্তব নীতিতেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট: মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিশোধের আশঙ্কায় ভারত অভিন্ন মুদ্রার বিরোধিতা করেছে, আর দক্ষিণ আফ্রিকা ডি-ডলারাইজেশনকে এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে যে তা কার্যকর করার পথে এগোয়নি। ফলে ডলারের আধিপত্যের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশ্নে ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলির অনীহা স্পষ্ট।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকাবিরোধী’ ব্রিকস নীতির সঙ্গে যুক্ত দেশগুলির উপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক বসানোর হুমকি ব্রিকসের ভিন্নমতের রাজনৈতিক সীমা স্পষ্ট করে দিয়েছে। মার্কিন বাজার ও ডলারের উপর নির্ভরশীল সদস্য রাষ্ট্রগুলির পক্ষে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া কতটা কঠিন, এই শুল্ক-হুমকিই তা দেখিয়ে দেয়। ব্রিকসের ভিন্নমত তাই মার্কিন-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা থেকে বিচ্ছেদের প্রকল্প নয়; বরং সেই ব্যবস্থার মধ্যেই নিজেদের জন্য আরও বেশি দর-কষাকষির জায়গা তৈরি করার চেষ্টা।
এই জায়গাতেই NDB-র ডলারে হিসাব রাখা ব্যালান্স শিটের সঙ্গে গাজার আকাশে উড়ে যাওয়া ড্রোনের যোগসূত্রটি স্পষ্ট হয়। ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলির শাসক শ্রেণি সাম্রাজ্যবাদী আর্থিক ব্যবস্থা ও অস্ত্রবাণিজ্যের পরিকাঠামোর সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত এবং সেই ব্যবস্থার মধ্যেই নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ কায়েম করে। তাই নিজেদের সেই স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে প্যালেস্টাইন বা অন্য কোনও প্রশ্নে ধারাবাহিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। গণহত্যার প্রশ্নে ব্রিকসের অভিন্ন অবস্থানের অনুপস্থিতিকে নিছক কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রগুলির অর্থনৈতিক কাঠামো ও শ্রেণিস্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেই বোঝা জরুরি। এটাই ব্রিকসের প্রকৃত চরিত্রকে বুঝতে সাহায্য করে: বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির একটি জোট, যারা একই সঙ্গে সেই বিশ্ববাজারের কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের স্বার্থের হিসাব মেলায়।
সংহতির প্রকৃত অর্থ কী?
বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলির মধ্যে প্রকৃত সংহতির একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে। তার মানে ইজরায়েলের উপর সামরিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা, তার যুদ্ধ অর্থনীতিকে সচল রাখে এমন কয়লা ও অপরিশোধিত তেল সরবরাহ বন্ধ করা, আদানি-এলবিট, গ্লেনকোর বা হাইফা বন্দরের মতো ইজরায়েলের সঙ্গে যুক্ত পুঁজির সঙ্গে সরকারি চুক্তি বাতিল করা। আর অবশ্যই IMF-এর নজরদারিতে ডলারে ঋণ নেওয়ার বদলে অবৈধ ঋণের হিসাব খতিয়ে দেখে তা প্রত্যাখ্যান করা, এবং দক্ষিণের দেশগুলির মধ্যে শোষণ ও নির্ভরতার বদলে পুনর্বণ্টন ও ক্ষতিপূরণের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। সংহতি তখনই বাস্তব অর্থ পায়, যখন তা কথার বাইরে গিয়ে এই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যমান ক্ষমতার সম্পর্ককে বদলানোর চেষ্টা করে।
এই দাবিগুলির কোনওটিই নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনের আলোচনায় জায়গা পায়নি। অথচ এই প্রশ্নগুলিই উঠছে অন্যত্র – সেই বন্দরগুলিতে, যেখানে শ্রমিকরা অস্ত্রের চালান জাহাজে তুলতে অস্বীকার করছেন; সেই ট্রেড ইউনিয়ন ও প্যালেস্টাইন সংহতি আন্দোলনের মধ্যে, যারা COSATU-র সমর্থনে গ্লেনকোরের দফতরের সামনে বিক্ষোভ করছেন; এবং সেই আন্দোলনগুলির মধ্যে, যারা রাষ্ট্রের উপর নির্ভর না করে ‘তলা থেকে ব্রিকস’ গড়ে তুলতে চাইছে।
গাজার যুদ্ধ ব্রিকসের কথার সঙ্গে কাজের ফারাককে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। বৈশ্বিক দক্ষিণের সংহতি তাই কোনও বিমূর্ত কূটনৈতিক ধারণা নয়; তার বাস্তব ভিত্তি রয়েছে শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন এবং গণআন্দোলনের লড়াইয়ে। রাষ্ট্রগুলি সেই সংহতির প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করতে পারে, কিন্তু তার প্রকৃত বাহক সেই আন্দোলনগুলি, যাদের কণ্ঠস্বর শীর্ষ সম্মেলনের টেবিলে জায়গা পায় না – বরং যাদের ঠেকিয়ে রাখতেই সেই সম্মেলনের দরজা পাহারা বসানো হয়।
1২০২৫ সালের রিও শীর্ষ সম্মেলনের সময় ব্রিকসের সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং ইন্দোনেশিয়া।
Editorial Board Member of Alternative Viewpoint
